দিনকে দিন গরমের মাত্রা কেবল বেড়েই চলছে। মাথার উপর বট গাছের আকার নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা করই গাছও সেই মাত্রা কমাতে পারছে না। মেরুদন্ড বেয়ে ঘাম কেবল প্রবাহিত হচ্ছে। আকাশে কালো মেঘের আস্তরণ আর তার ফাঁক ফোকর দিয়ে রোদের আলো গড়িয়ে পড়ছে। শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় এর সামনে একা দাড়িয়ে আছে আপন। ভর্তি পরীক্ষার কারণে এখানে আসা। একটু ছায়া পেলে বসে যাবার চিন্তা তার কিন্ত রাস্তার দুধারে করই গাছের ছায়া দখল করে আছে পরীক্ষার্থীদের সাথে আসা অভিভাবকবৃন্দ। সকলের মুখে চিন্তার ছাপ। সব চিন্তা আর টেনশন ঘনীভূত হয়ে গরমের মাত্রা আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে। আপনের বোনের মেয়ের পরীক্ষা আর সেই কারণেই তার এখানে আসা। পরীক্ষা চলাকালীন এই দেড় দুই ঘণ্টা কিছুই করার থাকে না শুধু অপেক্ষা করা ছাড়া। ঘড়ির কাঁটা কখন তার গন্তব্যে পৌঁছাবে সেটা ভাবতে ভাবতেই সময় এগিয়ে যায়। ঘড়ির কথা মনে পড়তেই আপন তার হাতে থাকা ঘড়ির দিকে তাকাল। এখন সময় ১১.৪৫, তার মানে পরীক্ষা শুরু হতে আরও ১৫ মিনিট বাকি তারপর একঘন্টার পরীক্ষা। মোট সোয়া এক ঘন্টা তাকে অপেক্ষা করে কাটিয়ে দিতে হবে। চারপাশ তাকাল সে। মানুষের ভীড় চারপাশ জুড়ে। কেউ বসে আছে আর সাথে মোবাইল টিপছে। কেউ কেউ কয়েকজনের গ্রুপ হয়ে গল্প জুড়ে দিয়েছে। তাদের সন্তানের ভবিষ্যত তারা এখানে বসেই নির্ধারণ করে দিচ্ছে।
সকল কিছু ছাপিয়ে নার্সারিটা চোখে পড়ল তার। অনেকদিন গাছ কিনে না সে। ভালোই হল আজ একটা গাছ কিনে নিয়ে যাবে। বাগানে অনেকদিন নতুন গাছের কোন সংযোজন নেই। নার্সারির দিকে হাটা শুরু করল সে। নার্সারিতে আসলেই তার মন ভালো হয়ে যায় যেমনটা ভালো হয় বইয়ের দোকানে গেলে। এই দুই জায়গাতে প্রাণ সঞ্চারী বাতাস আছে যার কাছে গেলেই মনের টবে পানি পড়ে, মন সজীব হয়। হরেক রকম ফুলে ভরা নার্সারির প্রান্তর। কাঠগোলাপ, বাহারি রঙ্গন, বেলী, টগর, কামিনী, বনবিলাস, বট গাছের বনসাই এবং আরো অনেক। কি গাছ কিনবে সেটা নিয়ে দ্বিধায় পড়ে গেলো সে। আরেকটু আগাতেই তার হৃদ কম্পন একটু ভারী হল। দূর থেকে দেখেও তার চিনতে কোন কষ্ট হয় নি। এক থোকা কাঠ গোলাপের দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিলো তরী। সাদা জামা গায়ে তার, দূর থেকে তাকেও কাঠগোলাপের একটা অংশ মনে হলো তার। শুভ্রতা তার রন্ধ্রে রন্ধ্রে। দ্বিধার পায়ে সামনে এগিয়ে গেলো সে।
কাছে যেতেই পরিচিত গায়ের গন্ধ। খোঁপা বাঁধা। একটা ফুল গুঁজে দিবার ইচ্ছা হলো। কিন্ত তার দেওয়া ফুল তরী খোঁপায় জড়াবে না এমন কথাই হয়েছিলো।
: হ্যালো মিস ব্যানার্জি।
তরী একটু হকচকিয়ে গেলো। পিছনে ফিরে ভূত দেখলে মানুষের মুখের ভাষা যেমন হয় সেই সময়টাতে তার এমন হল। এই মুখের ভাষা পড়ে আপনের মনে মনে হাসি পেলো।
: আপনি এখানে?
: আপনাকে ফলো করতে করতে চলে আসলাম।
: ভেরি ফানি।
: আপনি কি করছেন এখানে।
: ভাইয়ের পরীক্ষা। তাকে নিয়ে আসলাম।
: আচ্ছা। আমারও ভাগ্নীর পরীক্ষা।
: আচ্ছা।
: চলুন।
: কোথায়?
: হাতে এক ঘন্টা সময় আছে। এক কাপ কফি খাবার জন্য যথেষ্ট সময় এটা।
তরীকে দেখে মনে হল সে একটু দ্বিধায় পড়ে গেছে। আপনের সাথে যাবে কি যাবে না সেটা সে এখনও ডিসাইড করতে পারছে না।
: ঝামেলা নাই। এইটা সৌজন্য সাক্ষাৎ, কোন ডেটিং বা ঐরকম কিছু না।
: আমি জানি সেই রকম কিছু না। আচ্ছা চলুন।
রাস্তা পেরিয়ে তারা সামনের দিকে এগুলো। তাদের শেষ দেখা হয়েছিলো ফেব্রুয়ারিতে। শুভ পঞ্চমীর দিনে। এভাবেই তারা একসাথে অনেকদূর হেঁটে গিয়েছিলো। কিন্ত তারপর পথ হারিয়ে গেলো, সাথে তরীকেও নিয়ে গেলো।
তারা একটা কফি শপে ঢুকে চিজ বার্গার আর কফির অর্ডার দিয়ে বসে পড়ল।
: ভেবেছিলাম আপনার সাথে আমার দেখা দূর্গা পূজায়, ষষ্ঠীর দিনে। এত দ্রুত এভাবে আশা করিনি।
: ওটা হত না মে বি।
: ততদিনে তো আর আপনার বিয়ে হয়ে যেত না।
: তা যেত না। কিন্ত দেখা করে হবেই টা কি।
: কিছু হবার জন্য তো আর দেখা হত না। যদি হতোই তাইলে এতদিনে অনেক কিছুই হয়ে যেত। সে যাই হোক। আপনার হবু জামাইকে দেখলাম।
: কি স্পাইং করা শুরু করে দিয়েছেন?
: স্পাইং বললে ব্যাপারটা নেগেটিভ হয়ে যায়।
: আচ্ছা। কেমন দেখলেন।
: ভদ্রলোক অনেক স্মার্ট, হাইট ভালো। আপনার সাথে ভালো মানাবে। যদি আমাকে স্কোরিং করতে বলা হয় তাইলে আমি আমাকে দিবো ছয় আর উনাকে দিবো নয়।
ফিক করে হেসে দিলো তরী। অনেকদিন এই হাসিও দেখা হয়নি তার।
: হাসেন কেন?
: আপনার স্কোরিং এর নমুনা দেখে।
: তাইলে আপনি স্কোরিং করেন।
: আমার কোন ইচ্ছা নেই। তবে হ্যা উনি স্মার্ট আছে।
: সেটাই বললাম। আপনার রাজি হবার যথেষ্ট কারণ আছে।
: ওর থেকে ওর ফ্যামিলি আমার বেশী পছন্দ।
: আমার মতে ওকে পছন্দ হয়েছে বলেই তার ফ্যামিলি পছন্দ হয়েছে আপনার।
: আপনার মাথা। আপনি জানেন আমাদের যে ব্যাপার সেটা কখনোই সম্ভব না। আর আমি এইটা নিয়ে কখনোই চিন্তা করিনি তেমনভাবে।
: বেশ তো। ভালোই করেছেন। আমিই একটু পাগলামি করেছি। আর সেই জন্য দুঃখ প্রকাশ করছি।
: আরে ইটস ওকে।
তরীর সাথে বসলে সময় হুট করে কেটে যায়। যেই সময়টা ঘড়ির কাঁটার দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে কাটিয়ে দেবার কথা ছিলো সেই সময়টা হুট করে উধাও হয়ে গেলো।
: আমাদের উঠা দরকার। সময় হয়ে এল।
বিল নিয়ে ওয়েটার আসল সামনে। সে জানালো বিকাশে পেমেন্ট করবে সে। কিন্ত বেয়ারা জানালো তাদের এই সার্ভিস আপাতত বন্ধ। তরী বিল মিটাতে চাইল। কিন্ত আপন তা করতে দিলো না। সে তরীর জন্য আরেকটা কফির অর্ডার দিয়ে টাকা তোলার জন্য বেরিয়ে এল। টাকা তুলতে এসে সামনেই একটা ফুলের দোকান দেখতে পেল সে। সেখান থেকে একটি তাজা কমলা রঙের গোলাপ তুলে নিলো সে। দাম চুকিয়ে কফি শপে ঢুকে পড়ল। তার হাতে গোলাপ দেখে তরী একটু সংকুচিত হয়ে গেলো।
: অভিনন্দন। আপনাদের বিবাহিত জীবন সুখের হোক।
ফুলটা তরীর দিকে বাড়িয়ে দিলো সে। তরী একটু দ্বিধা প্রকাশ করলেও শেষমেষ ফুলটা নিলো।
: ফুলটা আপনাদের বিবাহিত জীবনের জন্য না।
: তাইলে?
: ফুলটা এইজন্য যে I still love you.
: পাগলামি হয়ে যাচ্ছে না।
: মোটেও না। পাগলামি করলে তো অনেক কিছুই করতাম।
: কি করতেন শুনি?
: না। চলুন উঠা যাক।
: এইটা আমার দ্বারা নেওয়া সম্ভব না।
: সম্ভব না হলে ফেলে দেন বা রেখে চলে যান।
: তবে তাই হোক।
বিল মিটিয়ে কফি শপ থেকে বেরিয়ে পড়ল তারা। টেবিলে পড়ে রইল একটা তরতাজা গোলাপ। একটু মন খারাপ হলো আপনের। তারপরও কিছু বুঝতে না দিয়ে সামনে তরীর সাথে এগিয়ে গেলো সে। হয়ত এটাই তাদের শেষ সাক্ষাৎ। একটু আগাতেই তরী থেমে গেলো। আপন কে কিছু না বলে পিছনে হাটা শুরু করল। আপনও পিছু পিছু হাটতে লাগল। কফিশপের সামনে এসে তরী ভিতরে ঢুকে গেলো। মিনিট পর যখন ফিরে এল তার হাতে গোলাপ দেখে আপনের খারাপ মন ভালো হয়ে গেলো। কিছু বলল না সে।
: আমি সরি।
: আরে ধুর। সরি বলার কিছু নেই। জগতে না হবার মত ঘটনা অনেক ঘটে যাচ্ছে। আমাদেরটা অনেকের মধ্যে ফেলে দিন।
: মাঝে মাঝে ফেলে দিতে চাইলেও ফেলা যায় না অনেক কিছু। দেখলেন না ফুলটা আমি ফেলে দিতে পারিনি।
আপন বলার জন্য কিছু খুঁজে পেল না। সে সবসময় এমনই। যেখানে কথা বলা দরকার সেখানে তার মুখ বুজে আসে, কথা হারিয়ে যায়। তরীকে আপন আপন করে পেতে চায় কিন্ত এটাও জানে সে যেভাবে তাকে চায় তরী ঠিক সেভাবে তাকে চায় না। তাই কিছু বলতে চেয়েও বলা হয় না।
সময় ফুরিয়ে এসেছে সাথে ফুরিয়ে এসেছে চলার পথও।
: আমার বিয়েতে আসবেন?
: আপনি চান আমি আসি?
: নাহ। চাই না। আমি কিছুই চাই না।
: তাইলে ধরে নিচ্ছি এটাই আমাদের শেষ দেখা।
: ভালো থাকবেন।
ছোটবেলায় অংক মিলানোর জন্য কত কিছুই ধরে নিতাম। সেই অংকের হিসাব মিলানোর জন্য ধরে নেওয়া ছাড়া উপায় ছিলো না। কিন্ত সবসময় সবকিছু অংকের বাইরে এসে ধরে নিলে সেখানে মিলে যাবার সম্ভাবনা বাদ দিতে হয়। প্রবাবিলিটি চলে আসে দৃশ্যপটে। আপনের সাথে এখন তরীর ধরাধরির খেলা চলছে। অনেক কিছু ধরে নিয়েও অনেক হিসাব মিলছে না, আবার না ধরেও অনেক হিসাব আপনা আপনি মিলে যাচ্ছে। যেমন আজকের এই সকাল, ধরাধরীর বাইরে থাকা সকালে তরীর সাথে দেখা হবার কথা না থাকলেও তাদের দেখা হয়ে গেল, কথাও হল। তরী তার জীবনে অসম্পূর্ণ একটা ছবি যেটা আপন আঁকতে চায় কিন্ত আঁকতে গিয়ে পেন্সিল আটকে যায় ক্রমশ অন্ধকার হয়ে আসে ক্যানভাস। দুজনের রিক্সা দু দিকে চলে গেলো, মাঝখানে আক্ষেপ, হতাশা আর না পাওয়ার যন্ত্রনা একসাথে একমিছিলে যোগ দিলো।
হুট করে গলির মুখে একটা ধমকা বাতাস বয়ে গেলো, রাস্তার ধারে শুয়ে থাকা ধূলা উরে এলো। ঝাপসা হয়ে এলো দৃষ্টি। সবদিক থেকেই এক অদ্ভূত ঝাপসা নেমেছে পৃথিবী জুড়ে।
Comments
Post a Comment