মাঝে মাঝে গল্পের আকারে অনেক কিছু ঘটে যায়। হুম ভুল বললাম মনে হচ্ছে। আসলে ঘটে যাওয়া জীবনের দৃশ্যপট থেকে কল্পিত গল্প রটে যায়। আমরা মঞ্চের কেন্দ্রবিন্দুতে দাড়িয়ে সেটা উপলদ্ধি করতে পারিনা। তো আজকের দিনটা ঠিক এমনই। গল্পের আকারে রটা। আজকে তরীর সাথে দেখা। তার ইচ্ছাতেই তার সাথে দেখা। তো মেয়েদের সাথে দেখা করাটা আপনের জন্য বিব্রতকর বরাবরের মতোই। বিব্রতকর এই জন্য যে তার অতীত অভিজ্ঞতা ভালো না এই ব্যাপারে। তো তরীর সাথে দেখা হবে সেটা আপনের জন্য একটু বিব্রতকর ঘটনা ছিলো বটে যদিও ভরসা বলতে এটুকু ছিলো যে তাদের আগে একবার দেখা হয়েছে আর সেই ক্ষেত্রে মনে সাহস ছিলো হয়ত পরিস্থিতি স্বাভাবিকই থাকবে। তো অফিস শেষে দেখা করার কথা। কাল থেকে মনে মনে ঘুরছিলো কি দেয়া যায় তাকে। সে ভেবেছিলো ফুল দিবে না। কিন্ত এডমিন স্যারের অভ্যর্থনার জন্য ফুল কিনতে গিয়ে তার জন্য ফুল কেনার লোভ সংবরণ করা গেলো না। ঠিক করা হলো সাথে একটা চিঠি আর দিবে একটা ডায়েরি।
তো অফিস থেকেই একটু আগেই বের হয়ে পড়ল আপন তার তরীর খুঁজে। কে কাকে খুঁজে নেবে কে জানে। আপন জানে না সে আসলেই তরীর তীরে পৌঁছাতে পারবে কি না। অত চিন্তা করতে তখন তার ইচ্ছা করছিলো না। রিক্সা ঠিক করে বিড়ি নিয়ে বসে পড়ল সে। ঢাকার রাস্তা জুড়ে মানুষ, গাড়ি আর তাদের সম্মিলিত সুরের এক সমাহার। সারা ঢাকা জুড়ে দূষণের যজ্ঞ বসেছে আর পুরান ঢাকায় মহাযজ্ঞ। যতই অগাচ্ছিলো সবকিছুই সমানতালে বাড়ছিলো। তরীর অভিযোজন ক্ষমতা ভালো বলতেই হবে। নাইলে এইখানে দমবন্ধ হয়ে এক মাসের মধ্যে পগারপার হয়ে যাবার কথা।
জ্যাম ডিঙিয়ে পৌঁছাতে পৌঁছাতে তার ৫ টা বেজে গেলো। শীতের আভাস পাওয়া যাচ্ছে। এখন দিন আগেই ফুরায় আর চারপাশে দানবসম পাহাড়ের মাঝখানে দূষণের বেড়াজাল তার আগেই এইখানে সন্ধ্যা বুনে। তরীর আসতে একটু লেট হবে। সে ম্যাসেজ করে জানিয়ে দিয়েছে। নাটক বা গল্পে নায়িকাকে দেখা যায় অপেক্ষা করতে আর এইখানে উল্টা ঘটনা। তাইলে কি তরী তার নায়িকা না। মনে মনে ভেবে নিলো ব্যাপারটা। একটা সিগারেট খেতে পারলে ভালো হইত। কিন্ত কখন তরী এসে পড়ে সেই ভয়ে আর সিগারেট খেলো না।
পাশে কমলালেবুর হাট নিয়ে বসে আছে দোকান দার। কমলাগুলা দেখতে রসালো মনে হচ্ছিলো। আপন আপন মনে গুনা শুরু করল আর ঠিক তখনই পাশ থেকে কেউ বলে উঠল
: কতক্ষণ হলো এসেছেন? :
অনেকক্ষণ।
আপন আর কথা খুঁজে পেল না। তার সেই ভয় ফিরে এল। তরীর কালো মাস্কে ঢাকা মুখ, চোখে কালো ভারী ফ্রেমের চশমা। চশমার ভেতর দিয়ে তীব্র চোখের দৃষ্টি। এই চোখ পরিচিত আপনের। কত একেছে এই চোখ।
: দুপুরে খেয়েছেন?
: টুকটাক। কলা আর রুটি।
: এইগুলা খাবার হলো নাকি?
: নিরামিষ চলে।
: আরেকটু আগে আসতে পারলে ইসকন মন্দিরে চলে যাওয়া যেত। তো কফিতে কোন নিষেধাজ্ঞা নেই তো।
: কফি খাওয়াই যায়।
এতক্ষণ চোখে লাগা জ্যাম, জমে থাকা মানুষ আর তীব্র কোলাহল তরীর উপস্থিতিতে জমে যেতে লাগল। তরীর পাশ ঘেঁষে হেঁটে চলা আপনের ভালোই লাগতে লাগল। তরীর উপস্থিতিতে আপনের দৃষ্টি কেমন সংক্ষিপ্ত হয়ে গেলো তরীকে ঘিরে।
কফি হাউজটা নীরব আর ঠান্ডা ছিলো। তরীর কথা স্পষ্ট কানে বাজতে লাগল। কান আর অন্য কোন শব্দ নিচ্ছে না। কফির অর্ডার দিয়ে আপন তরীর সম্মুখে বসে পড়ল। ভেবেছিলো অনেক কথা বলা হবে কিন্ত কথা তার সুর আর লয় হারিয়ে দ্বিধাগ্রস্ত হয়ে নিরুপায় হয়ে বসে রইল। তরী মাস্ক খুলে আর চুল ছেড়ে তার সামনে বসে। তরীকে সুন্দর লাগছে। একটা সাদা টপস আর রং খসা জিন্স। মুখে প্রসাধনীর কোন বালাই নেই। তারপরও তরীর চোখে মুখে আছে উজ্জ্বলতা, আছে সজীবতা। একটা কালো তিল আছে তার বামদিকের ঠোঁটের উপরে। সম্মোহনী দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকতে ইচ্ছা করে। কিন্ত ইচ্ছার সংবরণ করতেই হয়।
: কেমন কাটছে আপনার দিন।
: কেটে যাচ্ছে। আপনার কি অবস্থা।
: আমার অবস্থা ভালোই। সবকিছু পক্ষে চলে আসছে। বাড়ি থেকে বিয়ের চাপ কমে গেলো। এখন বাইরে যাবার প্রিপারেশন নিবো।
: চলে যাবেন?
: যেতে হবে। তবে ফিরে আসব।
: যে যায় সে কি আর ফিরে আসে?
: আমি আসব। আপনি যাবেন না বিদেশ?
: জানিনা। হাত দেখে জনৈক এক আচার্য বলেছিলো আমার বিদেশ ভাগ্য আছে।
: এইসব বিশ্বাস করেন আপনি?
: এইটাও জানি না। তবে মাঝে মাঝে অনেক জিনিস বিশ্বাস করতে ইচ্ছা করে।
: যেমন?
: যেমন উনি বলেছিলো আমার প্রেম করে বিয়ে হবে।
ফিক করে হেসে দিলো তরী। তরীর সাথে আপনের প্রেমে অনেক বাঁধা। অত বাধার ভিড় ঠেলে আপন কতদূর আগাতে পারবে সেটা সময়ের উপর ছেড়ে দিয়ে। আপন তার ব্যাগ থেকে তরীর জন্য আনা একগুচ্ছ গোলাপ তরীর দিকে বাড়িয়ে দিলো। আপন আর তরী দুইজনই একটু লজ্জা পেলো মনে হয়।
: এইগুলা কেন এনেছেন?
: দিতে ইচ্ছা হলো।
: আমাকে আর কখনো ফুল দেবেন না।
: কেনো?
: ফুল বাসি হয়ে যায়, ঝরে পড়ে। আমার ভালো লাগেনা।
: আচ্ছা গাছ দিবো তাইলে।
: দিয়েন।
: কবে নিবেন? আবার দেখা হবে কবে?
: আদৌ আর দেখা হবে কি না বলা যাচ্ছেনা।
: কেনো?
: এত কেনো কেনো করেন কেন বলেন তো। সারাদিন কিছু খান নাই। চলেন ইসকন মন্দিরের দিকে যাই। ঐখানে নিরামিষ পাওয়া যাবে।
তারা কফি খেয়ে বেরিয়ে পড়ল। তরী আসার আগে রাস্তা জুড়ে ছিলো জ্যাম আর কোলাহল। আসার পর বোধ হল সব হুট করে ফুরিয়ে গেছে। রাস্তায় ছিলো প্রয়োজনের চাইতে কম জ্যাম। গা ঘেঁষে হেঁটে যাওয়া লোকজন ছিলো অল্প। তারা অনেকটা দূর হেঁটে গেলো। বেশিদূর না কিন্ত মনে হচ্ছিলো অনেককাল। মাঝে তারা ধাক্কা খাচ্ছিলো একে অপরের সাথে। প্রিয়জনের স্পর্শ অল্প হইলেও অনুভূতি বিশাল। আপন টের পাচ্ছিল। পুরান ঢাকার গলির মুখ পেরিয়ে রিক্সা নিয়ে তারা বেরিয়ে পড়ল। এইদিক আপন চিনে না বলা চলে কিন্ত তরী পাশে থেকে সব চিনিয়ে দিচ্ছে তাকে। তরীর প্রিয় রাস্তা ধরে তারা এগিয়ে চলল।
সময় গড়াতে গড়াতে প্রায় তিন ঘণ্টা হতে চলল। কিন্ত মনে হচ্ছে এইত এইটুকুন সময় আরেকটু বাড়লে ক্ষতি কি ছিলো। তারপরও শেষ যা হবার তা হবেই। শেষ হবার আগে আপন ইসকন মন্দিরে গেলো ঐখান থেকে লোকনাথ বাবার মন্দির। এই মন্দিরে আপন তরী পৃথকভাবে প্রবেশ করতে হয়েছিলো। তরীর লোকচক্ষুর ভয় আছে। পরিচিত পরিবেশ তার পরিচিত কেউ দেখে ফেললে কেলেঙ্কারি বাঁধবে তাই পৃথকভাবে ঢুকে তারা পৃথকভাবে বের হয়ে ইসকনের হোটেলে লুচি আর ঢাল খেলো। এখন তারা চা খাচ্ছে। আপন ইতস্তত হয়ে ব্যাগ থেকে তরীর জন্য আনা চকলেটগুলো বের করলো।
: ধরেন এইগুলা।
: কি এইগুলা?
: পরীক্ষা চলছে আপনার। এনার্জি দরকার। পড়ার ফাঁকে ফাঁকে একটু একটু করে চকলেট খাবেন।
: আমি চকলেট খাই না। এইগুলা নিয়ে যান।
: রাখেন।
: দেখেন আপনি আমাকে ফুল দিয়েছেন, বই দিয়েছেন আবার ডায়েরী দিয়েছেন। চকলেট আমি নিতে পারব না।
: নেন।
: আচ্ছা এতগুলা নিবনা।
তরী আর আপন চায়ের কাপ নিয়ে এগিয়ে চলল। সময় ফুরিয়ে যাচ্ছে। আজ ভাতশূন্য দিনে আপনের অনেক ক্লান্তি থাকার কথা। কিন্ত তরীর সাথে থেকে শরীর শুধু হারিয়ে ফেলা চার্জ ফিরে পাচ্ছে। তারা হেঁটে যাচ্ছে এই শহরের সরু গলির পথ ধরে। মাঝে মাঝে হাঁটার তালে তাদের হাত একে অপরকে স্পর্শ করে যাচ্ছে। আলতো ছোঁয়া। তরীর সাথে আপনের সম্পর্কটা এইরকমই আলতো। তরী তার তীরে আপনকে ঘেঁষতে দেয়না। আবার আপন জোর করেও কিছু হাছিল করতে চাচ্ছেনা। যদি ভালবাসা থেকে থাকে তাইলে তাদের পথ আলাদা এখন থাকলেও পরে আর এরকম থাকবে না। আর না হলে যতই পথ এক করবার চেষ্টা তা একসময় দুইদিকে বেকে যাবেই।
সমাজ আছে আর আছে সমাজের প্রথা আর আমরা কেউই রাজা রামমোহন, বিদ্যাসাগর এর মত প্রথাবিরোধী হতে পারব না। প্রথার সাথে পরিবার জড়িয়ে অবস্থা আরো শোচনীয় করে রেখেছে। তরী আপনের নাগালের বাইরে থাকবে আপন জানে সেটা। আপনের অত কিছু পাওয়ার ইচ্ছাও নেই। আপন চায় তরী তাকে জানুক, তার নামে তরীর বুক কম্পিত হোক। একটা চিঠি লিখুক তরী তাকে যাতে দূরে থাকার পরামর্শ থাকলেও আপত্তি নাই।
বিদায় শব্দটার মাঝেই একটা দায় আছে। আর দায়গ্রস্থ হয়ে পড়ে বলেই বিদায় মুহুর্তে কষ্ট হয়, দুঃখ হয়। এইদিন আর এমন করে তরী আর আসবে কি? হয়ত আসবে আবার হয়ত আসবে না। কোন কিছুই জাগতিক নিয়মের বাইরে সংঘটিত হয়না। এই মুহুর্ত আপন মিস করবে, তরীর গায়ের স্পর্শ আপন মিস করবে, তার ভরাট দৃষ্টি, নির্লিপ্ত হাসি আপন মিস করবে সবই। তরীকে বলতে চেয়েও বলা হয়ে উঠেনি। এইদিন আর এমন দিনে মনে আফসোস রাখা নিষেধ। তরীর ঠিক করে দেওয়া রিক্সা চরে আপন ছুটে চলল তরীর থেকে অনেক দূরে। আফসোস নেই মনে। একটু সামনে গিয়ে একটা সিগারেট ধরাল। আরেকটা রিক্সা রিক্সার মামার দিকে এগিয়ে দিলো। এমন দিনের সকল দুঃখ ধোয়া হয়ে উড়ে যাক, সুখগুলো বন্টিত হোক সবার সাথে। তরী জানুক তরীর সুখেই আপন সুখী।
Comments
Post a Comment