Skip to main content

তিতাস একটি নদীর নাম

 নদীর উপর দিয়ে যখন আপন মনে তরী বইতে থাকে তখন বহমান বাতাস গায়ে মাখিয়ে স্রোত আর বইতে থাকা তরীর সংযোগে একটা সুন্দর শব্দ কানে আসে। আর সেই শব্দ অনেকখানি সময় ধরে কানের মধ্যে একটা সরু শীতলতা দান করে যার কল্যাণে শরীর আর মন কেমন জানি বহমান নদীর মত শান্ত আর সরল হয়ে যায়। জলের একটা ঢলে পড়ার শব্দ আছে। খুব ভালো লাগে শুনতে আর সেই শব্দের তাড়নায় কত শত লোক কান পেতেছে বলা দুষ্কর তবে কিছু লোক শুনে গেছেন আর লিখে গেছেন যেমনটা লিখে গেছেন কাহলিল জিব্রান। সন্ধ্যক্ষণের ঠিক পরে, শান্ত তিতাস নদীর বুকে আপনের তরী বইছে। 


নৌকার পাটাতনে বসে নদীর জলে পা ভিজিয়ে নদীর শান্ত স্রোত ভেঙে নৌকা বহমান। চারদিক কেমন যেনো শান্ত আর নিবিড়। সন্ধ্যার কালো ছায়া ক্রমশ জাল বিছাচ্ছে নদীর বুক জুড়ে, পাখিরা অনেক আগেই ফিরে গেছে নীরে। এখন আকাশ বাদুড়ের দখলে। এই শান্ত পরিবেশে শুধু শান্তভাবে বইছে গড়িয়ে পড়া জলের শব্দ। মাঝে মাঝে আপনের ইচ্ছা করে এই শব্দ নিয়ে দুটি কথা বলতে। যেমনটা সেই জিব্রান বলে গিয়েছিলেন- 

"And the brooks burst out in dance between the rocks, 

Repeating the song of joy;"


The song of joy- আনন্দের গান। আপনের সেই ক্যালিবার নাই আর কি কারণে আপনের মনে আজকাল আর কথা আসেনা। কথার খেয়াল তৈরি হয় কিন্তু লিখতে গেলে মনে হয় এ আমি এলাম কোথায়। সে যাই হোক নদীর নাম অনুসারে এই জায়গার নামও তিতাস। পদ্মা, মেঘনার বুকে বিচরণ করার পর তিতাস সেই অর্থে কিছুই না। না আছে স্রোত বা না আছে গভীরতা কিন্তু তারপরও তিতাস একটি নদীর নাম। আর এতেই তিতাস অনন্য। আর এই অন্যন্য কাজ করেছেন অদ্বৈত মল্লবর্মণ আর ঋত্বিক ঘটক, তিতাস নিয়ে উপন্যাস লিখে আর সেই লেখার উপর ছবি বানিয়ে। সেই থেকেই আপন মনে তিতাস নদীর নামে একটা ফ্যাসিনেশন আছে বলে ধরে নেওয়া যায়। 


তাই বাড়ি আসলেই সময় পেলে তিতাসের দিকে চলে আসে সে তার বন্ধুবান্ধব নিয়ে। ঘন্টা দুইএক এর জন্য নৌকা ভাড়া নিয়ে মাঝ নদীতে চলে যায় তারা। এভাবেই তিতাসের বুকে কিছু সময় কেটে যায়। গায়ে হওয়া লাগে, পরিষ্কার আর বিশুদ্ধ হাওয়া। ভেবে দেখেছে আপন স্থল থেকে জল তাকে বেশী টানে। জলের কাছে গেলে মনে হয় জীবনের সকল আবরণ নদীর বুকে বয়ে চলা বাতাস সরিয়ে ফেলে একটা বিশুদ্ধ রূপ বের করে নিয়ে আসে। জীবন বিশুদ্ধ হয় বা নতুন করে নতুন জিনিস শুরু করার প্রয়াস পায়। তাই সবসময় নদীর কাছাকছি যাওয়ার সুযোগ পেলে সেটা মিস করে না আপন। 


তিতাস ঘুরতে যতদিনই এসেছে আপন ঠিক ততদিনই বুক কেমন ভারী ছিলো তার আর আজকেও পরিস্থিতি কিছুটা সেরকমই। কিছু জিনিসকে মেনে নিতে হয় আসলে সবাইকেই। জীবন জুড়ে শুধুই যুদ্ধ চলে, এক মতের সাথে আরেক মতের আর ঠিক সেইক্ষনে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে না পারলে অনেক সময় বেসঠিক মত যুদ্ধে জয়ী হয়ে এসে ক্ষমতায় বসে। ঝামেলার শুরু সেখান থেকেই। তাই সঠিক ক্ষণে সঠিক সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলতে হয়। সেই রকমই কিছু মতের সিদ্ধান্ত নিতে না পেরে আপনের বিক্ষিপ্ত মন তিতাসের বুকে নিয়েছে আশ্রয়। তিতাস তাকে নিরাশ করেনি। মন শান্ত করেছে আর কানে কানে বলে গেছে কালের যবে হারিয়ে যাবে মুহুর্ত সব। 


এভাবেই বয়ে যাবে তিতাস, ভরা বর্ষায় তার ভরা যৌবন থাকবে আবার শীত এলে শুকিয়ে শীর্ণ হয়ে আসবে। সময় খুব গুরত্বপূর্ণ জিনিস এবং একই সাথে অনুকূল আর প্রতিকূলে স্রোতের মত বহমান জীবনে অপেক্ষা, উপভোগ, উপেক্ষা সবই ধৈর্য সহকারে সহ্য করতে হবে আর মাঝে মাঝে চলে আসতে হবে তিতাসের বুকে; দুঃখ বিসর্জন দিতে।

Comments

Popular posts from this blog

খামবন্দী মুহূর্ত

তোলা থাক মান-অভিমান, তোলা থাক বাক্সবন্দি কিছু স্বপ্ন, তোলা থাক রাজ্য জুড়ে তোমার নামে বয়ে যাওয়া মাতাল হাওয়া, তোলা থাক মরীচিকার বুকে ভেসে ওঠা তোমার অস্তিত্ব। তোলা থাক কলম, ফুরিয়ে যাক কালি, তোমার নামে লেখা ছোটগল্প, খামবন্দি চিঠির সারি। তোলা থাক গায়ে গা লাগানো, জ্যাম ঠেলে ছুটে চলা রিকশা, তোলা থাক অসমাপ্ত গানের লাইন, চোখে জমে থাকা নির্বাক কথামালা। তোলা থাক রাস্তার মোড়ে একটি নামের প্রতিধ্বনি— যেখানে সময় থমকে দাঁড়ায় তোমার অপেক্ষায়। তোলা থাক সবকিছু, তোলা থাক— যতদিন না জেগে ওঠে ঘুমন্ত শহর তোমার পদধ্বনিতে।

প্রতীক্ষা

  আমি দাঁড়িয়ে আছি, ঠিক সেখানেই যেখানে তুমি শেষবার দেখে গিয়েছিলে। নড়বড়ে মন তোমার— কাছে আসো, আবার ক্ষণিকেই দূরে সরে যাও। এমনটা কি ঠিক হবার ছিল? তুমি হয়তো হেঁটে যাবে সেই পথেই, হয়তো এড়িয়ে যাওয়ার গল্প আরও ভিড় জমাবে। হয়তো স্মৃতিগুলো অপুষ্টিতে ভুগবে, ঘুরে ফিরবে রাস্তায় রাস্তায়— এক মুঠো সময়ের জন্য। সে সময় হবে কি তোমার?

নাম না জানা কোন এক গল্প।

১৪ তারিখ, শুক্রবার। ছুটির দিনে কিছুটা ফাঁকা শহরে একা একা হাঁটছে আপন। শাখারি বাজারের সরু গলি দিয়ে যদিও হেঁটে যাওয়া খুব সহজ কাজ না তারপরও ছুটির দিন আর রোজার দিন হওয়াতে তার সাথে দেশের চলমান অস্থির পরিবেশে কেউ সুস্থিরভাবে বাইরে বের না হবার কারণেই হয়ত লোকজন এখানে এখনও কম।এই পরিস্থিতিতে হাঁটতে হাঁটতে একটা শাখা আর সিদুরের দোকানের সামনে দাঁড়াল আপন। ছোট্ট একটা দোকান কিন্তু সাজানো গুছানো আর সেখানে পরিপাটি সেজে বিশাল দাড়ির সমাহার নিয়ে দোকানের মালিক বসে আছে। লম্বা দাড়ির দিকে চোখ বুলাতে মনে হলো নানান রঙের বাহারে বাহারিত হইয়া আছে তার লম্বা দাড়ি। ঐতিহ্য কে ধরে আর ধারণ করে রাখার চেষ্টা, রঙের ঐতিহ্য, হোলির রং। কিন্তু প্রশ্ন হলো অনেক চাওয়ার পরেও কেউ কিছু ধরে রাখতে পারছে কি? আস্তে আস্তে হাত ফসকে কত কিছু বেরিয়ে যাচ্ছে সেই খেঁয়াল আছেই বা কজনের?  সে যাই হোক এখানে না আসলে আজকে যে হলি ছিলো তা বুঝত না সে।  এখনও যে এই শহরে একটু রং মৃদু বাতাসে উড়ে বেড়ায় তা এখানে না আসলে ইনস্টার রিল দেখে বুঝে নিতে হত। চারদিকে সারা সকাল আর দুপুরের ব্যস্ত রং ক্লান্ত হয়ে ঝিমুচ্ছে এখানে সেখানে রাস্তায় বা রাস্ত...