Skip to main content

কথোপকথন-০৩

অফিসের রুমটা তেমন একটা বড় নয়। আকৃতি বলতে গেলে বলতে হয় অধিক লম্বা আর কম প্রশস্তের অর্ধেক কাচে ঘেরা আর অর্ধেক ইটে তৈরি ছোট্ট একটা রুম। রুমের সৌন্দর্য বলতে দক্ষিণের একটা জানালা। তাও সবসময় পর্দার আড়ালে থাকে। এই জানালা দিয়ে আকাশের দিকে চোখ রাখলে রুমের সংক্ষিপ্ততা নির্লিপ্ত হয়ে যায়। যেদিন কাজ থাকেনা সেদিন পর্দার ফাঁকে চোখ রেখে মুক্ত বিহঙ্গের মুক্তি দেখে শুভ্র। আজ তেমনটা পারছে না। আজ কাজের চাপ একটু বেশী। প্রশাসনিক অনুমোদন নেবার জন্য খুব চিন্তা করে একটা নোটের খসরা তৈরি করে যাচ্ছে সে গত একঘন্টা ধরে। লেখা শেষ হল হল এমন সময় কোকিলের কণ্ঠী না হলেও মৃদু মোলায়েম পরিচিত কণ্ঠে কেউ রুমে আসার অনুমতি চাচ্ছে।  


শুভ্র প্রথম আপন মনে কাজ চালিয়ে যাচ্ছিলো। আবার অনুমতির ডাক আসাতে মুখ তুলে তাকাতেই সে বুঝে উঠার চেষ্টা করল সে যাকে দেখছে তা সে সত্যি দেখছে কি না। 

হুট করে এভাবে নিতুকে এখানে কল্পনা করেনি সে। 


: আসতে পারি?

: মানে আপনি কি সত্যি? 

: মানে? 

: যা দেখছি বা যাকে দেখছি সত্যি দেখছি কি না।

: চশমা পড়ে আছেন তো দেখা যাচ্ছে। 

: ফাঁকি দেবার সময় সবকিছুই ফাঁকি দেয়। 

: ফাঁকি হবে কেন? আর সবাই ফাঁকিবাজ না।  


কথার পিঠে কথা বলার নিপুণতা নিতুর, শুভ্রর ভাল্লাগে ব্যাপারটা। শুভ্র কিছু না বলে প্রসঙ্গ পাল্টিয়ে নিতুকে তার রুমে থাকা জানালার পাশের হাতলযুক্ত কালো চেয়ারটায় বসতে দিলো। 


: কি অবস্থা বলেন? কই যাচ্ছিলেন?

: কোথাও যাচ্ছিলাম না তবে আপনার এখানে আসলাম।

: আচ্ছা। আমার ছোট খাটো শীততাপ নিয়ন্ত্রিত রাজ্যে আপনাকে স্বাগতম। কি দিয়ে আপনার আগমন কে সার্থক করতে পারি বলুন। 

: সময় দিয়ে, যদি থাকে। 

: দেয়া যায় যদি আমাকে ১০ মিনিট আমার সময় দেন। ১০ মিনিট পর সবটা আপনার। 

: সময় দেখে দেখে তাইলে হিসাব নিবো। 

: নিয়েন। আমি দিতে রাজি। 

: হইছে। কথা না বলে কাজ শেষ করেন। দশ মিনিট শেষ হতে চলল।


শুভ্র হেসে আপন মনে ফাইল হাতে নিয়ে বেরিয়ে গেলো। এইত যে কাজ কিছুক্ষণ আগে অনেক মনে হচ্ছিল এখন সেই কাজ মামুলি হয়ে গেলো। শুধু মিনিট পাঁচেক সময় দিলেই সমস্যার সমাধান। নোটের খসড়া খোরশেদ কে বুঝিয়ে দিয়ে পরবর্তী কি করতে হবে নির্দেশনা দিয়ে একনীমিষে এডমিন স্যারকে কি বলতে হবে গুছিয়ে উনার রুমের দিকে চলল সে। 

: স্যার আসব?

: আসো। কি? কিছু বলবা? 

: প্রশাসনিক অনুমোদনের জন্য  ফাইল তুলে দেওয়া হইছে স্যার। 

: আচ্ছা। অনুমোদন হয়ে আসলে কাজ শুরু করে দাও। 

: জ্বী স্যার। এখন তো স্যার তেমন কোন কাজ নেই। আমি একটু বাইরে যেতে চাচ্ছিলাম জরুরি প্রয়োজনে। আপনার অনুমতি পেলে যাব। 

: আচ্ছা ঠিকাছে। আগামীকাল আপডেট দিও কাজের।

: জ্বী স্যার। যাই স্যার। 


স্যারকে সালাম দিয়ে বেরিয়ে গেলো শুভ্র। একটু হালকা আর উড়ু উড়ু লাগছে নিজেকে। আজকে নিজেকে আকাশে উড়তে থাকা পাখিদের প্রতিবেশী বলে মনে হচ্ছিলো। নিজের রুমের সামনে দাড়িয়ে একটু জিরালো সে। জীবন মনে হয় এরকমই। নিমেষেই মুহুর্তের রদ বদল ঘটে যায়। কোন ঘটনা কখন ঘটে বসে বলা মুশকিল। নিতু হুট করে চলে আসল। তার সাথে এভাবে প্রথম সাক্ষাৎ হবে এইরকম ঘটনা উপন্যাসের পাতাতেই পড়েছে সে। যেখানে নায়ক ও নায়িকার প্রথম সাক্ষাতে একটু বিচিত্রতা থাকে; থাকে একটু রোমাঞ্চকর অনুভূতি। শুভ্র এই রকম অনুভূতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে এখন। নিতু কি শুভ্রের জীবনে ঘটে যাওয়া উপন্যাসের সেই নায়িকা? না সে আর বেশী কিছু ভাববার চেষ্টা না করে রুমে ঢুকল। নিতু আকাশ দেখছে তার জানলা দিয়ে। সুন্দর লাগছে নিতুকে। সাদার মধ্যে হরেক রঙের ছোপছোপে আর নীল রঙের সিল্কি উরনাতে নিতুকে নীল আকাশের দেবী মনে হচ্ছিল। যার দ্যুতিতে শুভ্রর এই ছোট্ট অফিস রুম আরো আলোতে ভরে গেলো। 

: কি? তাকিয়ে আছেন কেন অমন করে?

: দেখছিলাম।

: কি দেখছিলেন? 

: নীল আকাশের দেবীকে। 

: দূর! ফ্লার্ট করেন ভালো আপনি। 

: এই এক দোষ। সত্যকে সত্য বললেই ধরে নেওয়া হয় ফ্লার্ট করা হচ্ছে। 

: আপনার রুমের এই একটা জিনিসই পরিপূর্ণ।

: এই জানালার চোখে আকাশ?

: হুম।

: এইজন্যই কাজ করে প্যারা পাই না। ক্লান্ত হয়ে পরলেই আকাশ দেখি। ক্লান্তি দূর হয়ে যায়?

: তো এখন কি ক্লান্ত?

: নাহ, দেবীর সাক্ষাতে ক্লান্তি দূর হয়ে গেছে। 

: আচ্ছা। চলেন বেরিয়ে পড়ি। 

: যাবো কই? 

: আমি যেখানে নিয়ে যাবো সেখানে যেতে আপত্তি আছে। 

: থাকার কথা তো কোনো কালেই ছিলো না। 

: চলেন তাইলে। 


শুভ্র আর নিতু পাশাপাশি হেঁটে অফিস থেকে বেরিয়ে পড়ল। যাবার পথে তার অফিস সহকারীরা তাকে সালাম দিচ্ছিলো। ভালোই লাগছিলো তার। এইরকম সিনও সে মুভিতে দেখেছিল। না আজ নায়ক হবারই দিন। নিতুর মুখেও মুচকি হাসি। নিতুও কি এইরকমই ভাবছে। সেও কি চায় তার নায়িকা হতে? ভাবতেই একটু ভয় হল। কতদূরে কি আছে, কি থাকে কেউ কি বলতে পারে? সকল ভাবনা বাদ দিয়ে পুরো সময়ের ভার সে নিতুর হাতে দিয়ে দিলো। ভারমুক্ত লাগছে তার এখন। নিতুর হেঁটে যাওয়া পথ ধরে হাঁটতে লাগলো তারা। 


Comments

Popular posts from this blog

আপনের দিনগুলি-০৩

  (তৃতীয় পর্ব) রাত অনেক, প্রচণ্ড শীত বাইরে। কনকনে শীতল হাওয়া বইছে। ঘুম আসছে না আপনের চোখে। বাসার নীচে, কাছাকাছি কোথাও হতে ট্রাক থেকে ইট নামানোর শব্দ কানে ভেসে আসে। এই শহর কখনো নীরব হয়না, রাতেও না। এই শহরের দেওয়ালগুলো কখনও নীরব শান্তির স্বাদ আস্বাদন করতে পারেনা। বিরামহীন শব্দের ভারে শ্রান্ত তাদের দাঁড়িয়ে থাকা। মাঝখানে ক’দিনের জন্য গ্রামের বাড়ি গিয়েছিলো সে। সেখানেও শীত ছিলো তবে শহরের মতো কোলাহল ছিলো না। আর কোলাহল এর অভাবে সেখানে শীতের মাত্রা আরও ভারী, নিঃশব্দের মাত্রা আরও প্রকট। টিনের চালে গাছের পাতা থেকে ঝরে পড়া শিশিরের শব্দ কানে আসত। কখনও দূর থেকে শিয়ালের ডাক, আর সেই ডাকে হঠাত জেগে উঠা গৃহে পালিত হাঁসের ভয় পাওয়া আর্তনাদ। ঘুম জড়িয়ে আসত চোখে।  আজ আপনের চোখে ঘুম নেই। তরীর কথা মনে পড়ছে না তো? তরীর কথা মনে না পড়লেও, স্মৃতিগুলা মনে হয় এই শীতের রাতেও লেপের উষ্ণতা নিয়ে ভর করতে চায় তার উপর। বিছানা ছেড়ে সিগারেট নিয়ে বারান্দায় গিয়ে গ্রীলের বাইরে চোখ রাখল আপন।  এভাবেই দিনের সাথে সাথে রাত কেটে যাচ্ছে তার। কিছুটা ঘোরের মধ্যে, কিছুটা ঘোরের বাইরে। বাসা থেকে অফিস, অফিস থেকে বাসা। ম...

আপনের দিনগুলি-০৪

  শীত শেষ। দিন দশেকের কাপুনিতে শীত যেন তার সর্বস্ব দিয়ে গেছে। এখন যা আছে বা যা অনুভূত হচ্ছে, তা হলো শীতকে জিইয়ে রাখার এক অদ্ভুত তাড়না। একসময় Winter is coming বললে একটা গম্ভীর আবহ তৈরি হতো। এখন গরমকাল আসার কথাতেই মানুষের হৃদয় কেঁপে উঠে। যেমনটা আজকাল প্রায়ই কেঁপে উঠে, ঘুমের মধ্যে কিংবা জেগে থাকতেই হঠাৎ করে বিল্ডিং কেঁপে উঠে; ইদানীং ভূমিকম্প হচ্ছে খুব।  গরমকাল মানেই এখন প্রচণ্ড গরম।  উত্তপ্ত চুলার ওপর ভাত যেমন ফটফট শব্দে ফুটতে থাকে, গরমের দিনে শরীরটাও তেমনই সিদ্ধ হতে থাকে। পার্থক্য শুধু এই, এখানে শব্দ শোনা যায় না। সবকিছু ভেতরে ভেতরে ঘুমরে থাকে। ফেব্রুয়ারি মাস চলে এলো। বারো মাসের এক বছরে এই মাসটা আপনের বরাবরের পছন্দের। প্রথমত, মাসটা ছোট। দ্বিতীয়ত, এটা ভালোবাসার মাস, যুগলবন্দী হবার মাস, সরস্বতী পূজার মাস, ভাষা শহীদের মাস, বইমেলার মাস। আর তরীর সঙ্গে প্রথম দেখা হওয়ার মাসও বটে। কিন্তু এই বছরটা কেমন যেন ব্যতিক্রম। শুভ পঞ্চমীর তিথি জানুয়ারিতে পড়ে যাওয়ায় ফেব্রুয়ারি আর সরস্বতী পূজার মাস হলো না। বইমেলাও হচ্ছে না। আরও অনেক কিছুই যেন হলো না। এই মাসটা ক্রমে ‘না-হবার মাস’ হয়ে উঠছে...

A Ruined Rose

  My days were fading away Like a rose forgotten, Between the warm pages of a book. Or  a rose lying silently  Upon the desk of a desolate soul, Slowly surrendering  To the quiet heat of the morning sun. Slowly it withered,  Losing fragrance, color and grace Until nothing remained  But the faint memory of a rose. Sometimes a life, too, Disappears in such silence.