অফিসের রুমটা তেমন একটা বড় নয়। আকৃতি বলতে গেলে বলতে হয় অধিক লম্বা আর কম প্রশস্তের অর্ধেক কাচে ঘেরা আর অর্ধেক ইটে তৈরি ছোট্ট একটা রুম। রুমের সৌন্দর্য বলতে দক্ষিণের একটা জানালা। তাও সবসময় পর্দার আড়ালে থাকে। এই জানালা দিয়ে আকাশের দিকে চোখ রাখলে রুমের সংক্ষিপ্ততা নির্লিপ্ত হয়ে যায়। যেদিন কাজ থাকেনা সেদিন পর্দার ফাঁকে চোখ রেখে মুক্ত বিহঙ্গের মুক্তি দেখে শুভ্র। আজ তেমনটা পারছে না। আজ কাজের চাপ একটু বেশী। প্রশাসনিক অনুমোদন নেবার জন্য খুব চিন্তা করে একটা নোটের খসরা তৈরি করে যাচ্ছে সে গত একঘন্টা ধরে। লেখা শেষ হল হল এমন সময় কোকিলের কণ্ঠী না হলেও মৃদু মোলায়েম পরিচিত কণ্ঠে কেউ রুমে আসার অনুমতি চাচ্ছে।
শুভ্র প্রথম আপন মনে কাজ চালিয়ে যাচ্ছিলো। আবার অনুমতির ডাক আসাতে মুখ তুলে তাকাতেই সে বুঝে উঠার চেষ্টা করল সে যাকে দেখছে তা সে সত্যি দেখছে কি না।
হুট করে এভাবে নিতুকে এখানে কল্পনা করেনি সে।
: আসতে পারি?
: মানে আপনি কি সত্যি?
: মানে?
: যা দেখছি বা যাকে দেখছি সত্যি দেখছি কি না।
: চশমা পড়ে আছেন তো দেখা যাচ্ছে।
: ফাঁকি দেবার সময় সবকিছুই ফাঁকি দেয়।
: ফাঁকি হবে কেন? আর সবাই ফাঁকিবাজ না।
কথার পিঠে কথা বলার নিপুণতা নিতুর, শুভ্রর ভাল্লাগে ব্যাপারটা। শুভ্র কিছু না বলে প্রসঙ্গ পাল্টিয়ে নিতুকে তার রুমে থাকা জানালার পাশের হাতলযুক্ত কালো চেয়ারটায় বসতে দিলো।
: কি অবস্থা বলেন? কই যাচ্ছিলেন?
: কোথাও যাচ্ছিলাম না তবে আপনার এখানে আসলাম।
: আচ্ছা। আমার ছোট খাটো শীততাপ নিয়ন্ত্রিত রাজ্যে আপনাকে স্বাগতম। কি দিয়ে আপনার আগমন কে সার্থক করতে পারি বলুন।
: সময় দিয়ে, যদি থাকে।
: দেয়া যায় যদি আমাকে ১০ মিনিট আমার সময় দেন। ১০ মিনিট পর সবটা আপনার।
: সময় দেখে দেখে তাইলে হিসাব নিবো।
: নিয়েন। আমি দিতে রাজি।
: হইছে। কথা না বলে কাজ শেষ করেন। দশ মিনিট শেষ হতে চলল।
শুভ্র হেসে আপন মনে ফাইল হাতে নিয়ে বেরিয়ে গেলো। এইত যে কাজ কিছুক্ষণ আগে অনেক মনে হচ্ছিল এখন সেই কাজ মামুলি হয়ে গেলো। শুধু মিনিট পাঁচেক সময় দিলেই সমস্যার সমাধান। নোটের খসড়া খোরশেদ কে বুঝিয়ে দিয়ে পরবর্তী কি করতে হবে নির্দেশনা দিয়ে একনীমিষে এডমিন স্যারকে কি বলতে হবে গুছিয়ে উনার রুমের দিকে চলল সে।
: স্যার আসব?
: আসো। কি? কিছু বলবা?
: প্রশাসনিক অনুমোদনের জন্য ফাইল তুলে দেওয়া হইছে স্যার।
: আচ্ছা। অনুমোদন হয়ে আসলে কাজ শুরু করে দাও।
: জ্বী স্যার। এখন তো স্যার তেমন কোন কাজ নেই। আমি একটু বাইরে যেতে চাচ্ছিলাম জরুরি প্রয়োজনে। আপনার অনুমতি পেলে যাব।
: আচ্ছা ঠিকাছে। আগামীকাল আপডেট দিও কাজের।
: জ্বী স্যার। যাই স্যার।
স্যারকে সালাম দিয়ে বেরিয়ে গেলো শুভ্র। একটু হালকা আর উড়ু উড়ু লাগছে নিজেকে। আজকে নিজেকে আকাশে উড়তে থাকা পাখিদের প্রতিবেশী বলে মনে হচ্ছিলো। নিজের রুমের সামনে দাড়িয়ে একটু জিরালো সে। জীবন মনে হয় এরকমই। নিমেষেই মুহুর্তের রদ বদল ঘটে যায়। কোন ঘটনা কখন ঘটে বসে বলা মুশকিল। নিতু হুট করে চলে আসল। তার সাথে এভাবে প্রথম সাক্ষাৎ হবে এইরকম ঘটনা উপন্যাসের পাতাতেই পড়েছে সে। যেখানে নায়ক ও নায়িকার প্রথম সাক্ষাতে একটু বিচিত্রতা থাকে; থাকে একটু রোমাঞ্চকর অনুভূতি। শুভ্র এই রকম অনুভূতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে এখন। নিতু কি শুভ্রের জীবনে ঘটে যাওয়া উপন্যাসের সেই নায়িকা? না সে আর বেশী কিছু ভাববার চেষ্টা না করে রুমে ঢুকল। নিতু আকাশ দেখছে তার জানলা দিয়ে। সুন্দর লাগছে নিতুকে। সাদার মধ্যে হরেক রঙের ছোপছোপে আর নীল রঙের সিল্কি উরনাতে নিতুকে নীল আকাশের দেবী মনে হচ্ছিল। যার দ্যুতিতে শুভ্রর এই ছোট্ট অফিস রুম আরো আলোতে ভরে গেলো।
: কি? তাকিয়ে আছেন কেন অমন করে?
: দেখছিলাম।
: কি দেখছিলেন?
: নীল আকাশের দেবীকে।
: দূর! ফ্লার্ট করেন ভালো আপনি।
: এই এক দোষ। সত্যকে সত্য বললেই ধরে নেওয়া হয় ফ্লার্ট করা হচ্ছে।
: আপনার রুমের এই একটা জিনিসই পরিপূর্ণ।
: এই জানালার চোখে আকাশ?
: হুম।
: এইজন্যই কাজ করে প্যারা পাই না। ক্লান্ত হয়ে পরলেই আকাশ দেখি। ক্লান্তি দূর হয়ে যায়?
: তো এখন কি ক্লান্ত?
: নাহ, দেবীর সাক্ষাতে ক্লান্তি দূর হয়ে গেছে।
: আচ্ছা। চলেন বেরিয়ে পড়ি।
: যাবো কই?
: আমি যেখানে নিয়ে যাবো সেখানে যেতে আপত্তি আছে।
: থাকার কথা তো কোনো কালেই ছিলো না।
: চলেন তাইলে।
শুভ্র আর নিতু পাশাপাশি হেঁটে অফিস থেকে বেরিয়ে পড়ল। যাবার পথে তার অফিস সহকারীরা তাকে সালাম দিচ্ছিলো। ভালোই লাগছিলো তার। এইরকম সিনও সে মুভিতে দেখেছিল। না আজ নায়ক হবারই দিন। নিতুর মুখেও মুচকি হাসি। নিতুও কি এইরকমই ভাবছে। সেও কি চায় তার নায়িকা হতে? ভাবতেই একটু ভয় হল। কতদূরে কি আছে, কি থাকে কেউ কি বলতে পারে? সকল ভাবনা বাদ দিয়ে পুরো সময়ের ভার সে নিতুর হাতে দিয়ে দিলো। ভারমুক্ত লাগছে তার এখন। নিতুর হেঁটে যাওয়া পথ ধরে হাঁটতে লাগলো তারা।
Comments
Post a Comment