Skip to main content

বিচ্ছিন্ন আলাপ

 ছিলো ভাবে ভরা দুটি আঁখি চঞ্চল।

তুমি বাতাসে উড়ালে ভীরু অঞ্চল।"


আজকাল মাথার মধ্যে কথা তেমন আসেনা। আশেপাশে বইয়ে কিংবা মোবাইলে অনেককিছু পড়া হয়, লিখে রাখতে ইচ্ছা হয় অনেককিছু কিন্তু তারপরও লিখতে বসলে হাত অসাড় হয়ে যায়, মনের ডিকশনারি শব্দ শূন্য হয়ে যায়। চোখের সামনে মরুর বুক ভেসে আসে, তপ্ত বালির বুকে শুধুই খাঁ খাঁ করা শূন্যতা। চারপাশ তাকিয়ে দেখলে দুই এক জায়গা বাদে কোথাও নেই সবুজের অস্তিত্ব। মনের মধ্যে ঠিক এমন খালি আর অনুর্বর একটা জায়গার অস্তিত্ব আজকাল টের পায় আপন। 


উষ্ণ ছুটির দুপুরে ফ্লোর বিছানায় গা এলিয়ে দিয়ে বাইরে তাকিয়ে আছে সে। খুব দূরে দৃষ্টি দিয়ে এই শহরে কিছু দেখা যায়না, চোখের সামনেই প্রতিবেশীর বাসন কোসন এর টুং টাং শব্দ বা দাঁড়িয়ে আছে গায়ে মস মাখিয়ে সময়ের প্রবাহে বিবর্ণ দেয়াল। উপরে একটুখানি আকাশ আর তার বুকে দানা দানা মেঘ, বৃষ্টির একটা আভাস থাকলেও হওয়ার মধ্যে সেই আভাস নেই। গরম একটা বাতাস চারপাশ ভারী করে বসে আছে। বালিশের পাশে থাকা মোবাইল থেকে ভেজে যাচ্ছে ‘আমি দূর হতে তোমারেই দেখেছি, আর মুগ্ধ এ চোখে চেয়ে থেকেছি। 


"কেন যামিনী না যেতে জাগালে না, বেলা হল মরি লাজে।

  শরমে জড়িত চরণে কেমনে চলিব পথেরি মাঝে।"


গান বেজে যাচ্ছে আর বয়ে যাচ্ছে বেলা। মাঝে মাঝে পিছন ফিরে তাকালে মনে হয় কত পথ হাঁটা হয়ে গেছে আবার একই পথ কত রূপে সময়ের আবর্তনে পরিবর্তিত হয়েছে। যে পথ একসময়ে মেঠো ছিলো, কাদায় কর্দমাক্ত ছিলো সেই একই পথে একসময় ইট গাঁথা হয়েছে, পিচ ঢালা পথ হয়েছে আবার কাল পেরিয়ে সেই পথেই ভাঙন ধরেছে। ভাঙ্গা আর গড়ার খেলা একই পথকে কেন্দ্র করে। জীবন জুড়েই এমন খেলা চলছে। যার গড়ার সুযোগ আছে সে গড়ে নিচ্ছে আবার যার সুযোগ নেই সে ভেঙে যাচ্ছে বা মাঝে মাঝে নিশ্চিহ্ন হয়ে যাচ্ছে তার চলার পথ। আপনের পথ কোন দিকে আছে বা যাচ্ছেই কোন দিকে? এই প্রশ্ন মনের মধ্যে কেবল ঝড় তুলে যায়, উত্তর খুঁজে চলে তার নিরন্তর মন কিন্তু উত্তর পত্র ঝড়ো হাওয়ায় ছিন্ন বিচ্ছিন্ন হয়ে ভেসে বেড়ায়। তার উত্তর মিলে না। 


"প্রথম দিনের সূর্য

প্রশ্ন করেছিলো সত্তার নূতন আবির্ভাবে-

কে তুমি?

মেলে নি উত্তর।

বৎসর বৎসর চলে গেলো

দিবসের শেষ সূর্য

শেষ প্রশ্ন উচ্চারিল 

পশ্চিম সাগর তীরে 

নিঃস্তব্ধ সন্ধ্যায়- 

কে তুমি?

পেলো না উত্তর।" 


ফ্যানের বাতাসে বইয়ের উল্টানো পৃষ্ঠায় উল্টে যাচ্ছে লিখাগুলি। তীরের কথা মনে আসাতে তরীর কথা মনে আসল আপনের। তরীর তীরে জায়গা বরাদ্দ না পেয়ে বিক্ষিপ্ত মন খালি এদিক সেদিক ঘুরে বেড়ায়। অনেক দূরে চলে এসেছে আপন সেই তীর থেকে। সামনে তাকালে শুধু মরীচিকার জ্বল জ্বল ছাড়া আর কিছু চোখে পড়ে না। চশমার চোখে আর বেশী দেখার ইচ্ছাও আজকাল সীমিত হয়ে যাচ্ছে। শুধুই বলে যাওয়া সময় ফুরিয়ে যাচ্ছে, পথ গুছানো অনেক বাকি। 


সময় গড়াতে গড়াতে এখন গোধূলির আলো। গেরুয়া রঙের আকাশে এখন একাকীত্বের ছাপ। এক আকাশে কতকিছু দেখা যায়। শুভ্র সাদা থেকে নীল, মাঝে মাঝে রংধনুর সাত রঙে আকাশে কত রং হচ্ছে বিলীন। সময়ের সাথে সাথে অবস্থান বদলাতে হয়। একজয়গায় দাঁড়িয়ে থেকে মশার কামড় কপালে জুটিয়ে অপেক্ষা করা বৃথা। তাই অপেক্ষা শব্দটাকে বাদ দিয়ে দীর্ঘশ্বাস দীর্ঘ না করে বের হয়ে যেতে হবে। অনেক পথ আছে কল্পনার রাজ্যে শুধু ইচ্ছা নিয়ে বের হতে হবে। হারিয়ে যেতে হবে না ফিরে আসার রাজ্যে তাইলেই মনে হয় শান্তি আর সমৃদ্ধি আসবে জীবনে। 


"আমার এই পথ-চাওয়াতেই আনন্দ।

খেলে যায়  রৌদ্র ছায়া, বর্ষা আসে বসন্ত ।"


মাঝে মাঝে অন্তঃসারশূন্য লাগে সবকিছু। উপযুক্ত পরিবেশের অভাবে মনের অভাব কোনভাবেই কাটছে না, তাই দুর্বল মন সবল হতে পারেনা। পরিবেশের অভাবে জীবন থেকে হারিয়ে যাচ্ছে রস তথা সেন্স অব হিউমার। যে কথা বলতে চাওয়া হয় সে কথা শুনার মানুষ নাই আবার যে কথা শুনতে চাওয়া হয় সেটা বলার মানুষ নাই। সবার মধ্যে স্বৈরাচারী মনোভাব হাসিনার মতো আর তাই এইদেশে সংস্কার একটা কঠিন জিনিস। সংস্কার সরকারের না, করা উচিত মনন আর মানসিকতার। তাই এই ঘটে যাওয়া ছোট খাট আন্দোলনে মন সায় দেয়না। সরকারি চাকুরীজীবী হিসেবে অভিজ্ঞতা হচ্ছে আরও বেশী। চেয়ারের লোভ আর আমলাদের কূটনীতি অতিষ্ট আর মেধাশূন্য করে দিচ্ছে সব। এই কথা কেউ বলে না আর এই সংস্কার কেউ চায়না আর এতসব দেখে হতাশা যায় আরও বেড়ে। অসুন্দর পরিবেশে মন কখনও সুন্দর ভাবে বাঁচতে পারেনা। এই দেশ ক্রমশ অসুন্দর হয়ে যাচ্ছে এইটাই পরিতাপের বিষয়। 


সে যাই হোক মরুভূমির বুকে বৃষ্টি নামলে সেখানে সবুজ চাদর বিছিয়ে দেয়। এই যে বৃষ্টির প্রভাবে মরুভূমির স্বভাবে যে পরিবর্তন আসছে তা কিভাবে বা তার অন্তর্নিহিত তাৎপর্য কি সেটা ব্যাখ্যাতীত। এখন একসাথে এক পথে হেঁটে, গায়ে গা ঘেঁষে রিক্সায় চড়ে বসে কেউ যদি বলে আমি কোনদিন কারো প্রেমে পড়ি নাই তাইলে সেটাও একটা ব্যাখ্যার অতীত বলেই চালিয়ে দেওয়া যাবে। জীবন আসলে এমনই। এক জীবনে এমন অনেক কিছুই আছে যা কিছু না বলে চালিয়ে দেওয়া যায়। একদিকে গুরুত্ব দিয়ে আরেক জায়গা গুরুত্বহীন করে দিতে হয় প্রকৃতির প্রয়োজনেই। 


সে যাই হোক সাদা শার্ট আপনের খুব পছন্দের। তার শিশুকাল থেকে এখনকাল পর্যন্ত সবকালেই একটা সাদা শার্ট থাকতোই। কিন্তু এই শহরে সাদা শার্ট পড়া যায়না। একদিন পড়লেই শার্টের কলার দেখে বলে দেওয়া যায় এই শহরের দূষণের মাত্রা। সাদা শার্ট আর সাদা মন নিয়ে বেশী ঘুরাঘুরি করা যায়না কেননা দূষণ এসে দূষিত করবেই, সে আপনি যত সাদা থাকার চেষ্টা করেনই না কেনো। তো মরুর বুকে লেখা কিছু নাম দূষণ হবার আগেই মুছে দিলে ঘুচে যায় অনেক ঝামেলা। 


"এই বালুকা বেলায় আমি লিখেছিনু,

আজ সাগরের ঢেউ দিয়ে তারে যেন মুছিয়া দিলাম ।।


বাজতে বাজতে এই গানের মধ্য দিয়েই এই বেলা শেষ হলো। 




Comments

Popular posts from this blog

আপনের দিনগুলি-০৩

  (তৃতীয় পর্ব) রাত অনেক, প্রচণ্ড শীত বাইরে। কনকনে শীতল হাওয়া বইছে। ঘুম আসছে না আপনের চোখে। বাসার নীচে, কাছাকাছি কোথাও হতে ট্রাক থেকে ইট নামানোর শব্দ কানে ভেসে আসে। এই শহর কখনো নীরব হয়না, রাতেও না। এই শহরের দেওয়ালগুলো কখনও নীরব শান্তির স্বাদ আস্বাদন করতে পারেনা। বিরামহীন শব্দের ভারে শ্রান্ত তাদের দাঁড়িয়ে থাকা। মাঝখানে ক’দিনের জন্য গ্রামের বাড়ি গিয়েছিলো সে। সেখানেও শীত ছিলো তবে শহরের মতো কোলাহল ছিলো না। আর কোলাহল এর অভাবে সেখানে শীতের মাত্রা আরও ভারী, নিঃশব্দের মাত্রা আরও প্রকট। টিনের চালে গাছের পাতা থেকে ঝরে পড়া শিশিরের শব্দ কানে আসত। কখনও দূর থেকে শিয়ালের ডাক, আর সেই ডাকে হঠাত জেগে উঠা গৃহে পালিত হাঁসের ভয় পাওয়া আর্তনাদ। ঘুম জড়িয়ে আসত চোখে।  আজ আপনের চোখে ঘুম নেই। তরীর কথা মনে পড়ছে না তো? তরীর কথা মনে না পড়লেও, স্মৃতিগুলা মনে হয় এই শীতের রাতেও লেপের উষ্ণতা নিয়ে ভর করতে চায় তার উপর। বিছানা ছেড়ে সিগারেট নিয়ে বারান্দায় গিয়ে গ্রীলের বাইরে চোখ রাখল আপন।  এভাবেই দিনের সাথে সাথে রাত কেটে যাচ্ছে তার। কিছুটা ঘোরের মধ্যে, কিছুটা ঘোরের বাইরে। বাসা থেকে অফিস, অফিস থেকে বাসা। ম...

আপনের দিনগুলি-০৪

  শীত শেষ। দিন দশেকের কাপুনিতে শীত যেন তার সর্বস্ব দিয়ে গেছে। এখন যা আছে বা যা অনুভূত হচ্ছে, তা হলো শীতকে জিইয়ে রাখার এক অদ্ভুত তাড়না। একসময় Winter is coming বললে একটা গম্ভীর আবহ তৈরি হতো। এখন গরমকাল আসার কথাতেই মানুষের হৃদয় কেঁপে উঠে। যেমনটা আজকাল প্রায়ই কেঁপে উঠে, ঘুমের মধ্যে কিংবা জেগে থাকতেই হঠাৎ করে বিল্ডিং কেঁপে উঠে; ইদানীং ভূমিকম্প হচ্ছে খুব।  গরমকাল মানেই এখন প্রচণ্ড গরম।  উত্তপ্ত চুলার ওপর ভাত যেমন ফটফট শব্দে ফুটতে থাকে, গরমের দিনে শরীরটাও তেমনই সিদ্ধ হতে থাকে। পার্থক্য শুধু এই, এখানে শব্দ শোনা যায় না। সবকিছু ভেতরে ভেতরে ঘুমরে থাকে। ফেব্রুয়ারি মাস চলে এলো। বারো মাসের এক বছরে এই মাসটা আপনের বরাবরের পছন্দের। প্রথমত, মাসটা ছোট। দ্বিতীয়ত, এটা ভালোবাসার মাস, যুগলবন্দী হবার মাস, সরস্বতী পূজার মাস, ভাষা শহীদের মাস, বইমেলার মাস। আর তরীর সঙ্গে প্রথম দেখা হওয়ার মাসও বটে। কিন্তু এই বছরটা কেমন যেন ব্যতিক্রম। শুভ পঞ্চমীর তিথি জানুয়ারিতে পড়ে যাওয়ায় ফেব্রুয়ারি আর সরস্বতী পূজার মাস হলো না। বইমেলাও হচ্ছে না। আরও অনেক কিছুই যেন হলো না। এই মাসটা ক্রমে ‘না-হবার মাস’ হয়ে উঠছে...

A Ruined Rose

  My days were fading away Like a rose forgotten, Between the warm pages of a book. Or  a rose lying silently  Upon the desk of a desolate soul, Slowly surrendering  To the quiet heat of the morning sun. Slowly it withered,  Losing fragrance, color and grace Until nothing remained  But the faint memory of a rose. Sometimes a life, too, Disappears in such silence.