Skip to main content

যাপিত জীবন

 একা একটা বিশাল পুকুরের সামনে একা বসে আছে আপন। সামনে বিস্তৃত আকাশ কিন্তু যে জায়গায় আপন বসে আছে সেখানে একটা বাগানবিলাস খুব আয়োজন করে ঝেঁকে বসে সামনের বিস্তৃততাকে একটু আড়াল করে রেখেছে ঠিক যেমন আড়াল করে রাখে নববধূ তার মুখ ঘুমটা দিয়ে। সন্ধ্যাকালীন সময় আর আশেপাশে কেউ নেই এমন এক পরিস্থিতিতে ঝিরঝির বৃষ্টির মাঝে চুপচাপ বসে থেকে জীবনের একটা সংজ্ঞা খুঁজার চেষ্টা তার। পুকুরের জলে তেলাপিয়া ছানার যেমন অস্থির নাড়াচাড়া তেমনটা অস্থির তার জীবন। তাই জীবনের সংজ্ঞা খুঁজতে গিয়ে বলা চলে একটু বেগ পেতে হচ্ছে তাকে। 


জীবনের সংজ্ঞা টা আপন এখনো ঠিক স্থির করে দাড় করাতে পারেনি। আর তাই হয় তো একটা অস্থিরতার সুর নিয়ত আচ্ছন্ন করে রাখে তাকে। একা বলেই কি এই সুর ক্রমশ তাকে ঘিরে রাখে না একা থাকার জন্যই এই সুর সেটা নিরূপণ করার চেষ্টা তার। ঝির ঝির বৃষ্টি ক্রমশ বাড়তে বাড়তে এখন ঝুম বৃষ্টিতে পরিণত হয়েছে। ঘন পাতার ফাঁক গলে কিছু ফোঁটা এখন আপনের গায়ে লাগছে। তার মন্দ লাগছে না এমনভাবে ভিজতে তাই এই স্থান ছেড়ে বেরিয়ে যাবার চিন্তা মাথা থেকে বের করে দিল সে। 


পরিস্থিতি মানুষকে স্বাভাবিক রাখে আবার অস্বাভাবিক করে তোলে। আর তাই পরিস্থিতির সঠিক রূপ ধরে রাখা  বা তা চিনতে পারার মধ্যে একটা কৃতিত্ব থাকে যা অনেকের থাকে না। আর তখনই পরিস্থিতির শিকার হয় মানুষ। মাঝে মাঝে নিজেকে তার পরিস্থিতির শিকার বলে মনে হয়। গুছানোর চেষ্টা করতে করতে কবে কখন যে জীবন অগুছালো হয়ে গেলো তা সে বলতেই পারল না। জীবন কি তাইলে এমনই? সবার এমন না মনে হয়। সবাই যার যার জীবন গুছিয়ে রাখতে পছন্দ করে। প্রচেষ্টার মাধ্যমে অগুছালো জীবন কেউ গুছিয়ে ফেলে আবার কেউ কিছুই পারে না। কিছু মানুষ গুছিয়ে চলার চেষ্টা করলেও অনেক সময় চলতে পারেনা পরিস্থিতির কারণে। 


পুকুর জুড়ে বৃষ্টির ফোটার আন্দোলিত ঝরে পড়া, আন্দোলিত হচ্ছে মন। পুকুর পাড়ে দাঁড়িয়ে থাকা ল্যাম্পপোস্টের গায়ে লেগে থাকা আলোর মধ্যে বৃষ্টির ফোঁটা দেখা যাচ্ছে কিন্তু তা আধার গুচাচ্ছে না বরং আধারের ঘনত্ব বাড়িয়ে দিয়েছে। আলোর মধ্যেই আধাঁরের উপস্থিতি টের পাওয়া যায়। মনের মধ্যে আধার ক্রমশ নিবিড় হচ্ছে। আলোকিত সকল বিষয়বস্তু ক্রমশ ঝাপসা হচ্ছে। জীবন যুদ্ধে ক্রমশ বেড়ে যাচ্ছে পিছিয়ে যাওয়া পথ। এত শত মানুষের মধ্যে কেউ একা থাকতে চাইলেও একা থাকতে পারেনা বরং যেখানে মানুষ কম সেখানে একা থাকা সহজ। 


বৃষ্টি কমে আসছে, আন্দোলনও শান্ত হচ্ছে ক্রমশ। পুকুর পাড়ে ইট বাঁধানো রাস্তা ধরে বেড়িয়ে পড়া জীবন। এই রাস্তা একা এক মানুষের জন্যই। মাঝে মাঝে খুঁজে ফেরা প্রশ্নের উত্তর এমনি এমনি চলে আসে চারপাশ দেখতে দেখতে। অক্টোবর মাসে বর্ষাকালীন বৃষ্টি ঝরে পড়ছে। প্রকৃতি আর পরিবেশ দিন দিন কেমন জানি অস্বাভাবিক ভাবে নিজেদের রূপ বদল করে নিয়েছে। যেই মাসে পথ বিছিয়ে কুয়াশার আভা গায়ে মাখিয়ে শিউলি ফোঁটার কথা সেই মাসে হচ্ছে প্রচণ্ড বৃষ্টি। 


অক্টোবর মাস আপনের পছন্দের মাস। এই মাসে এক সময় কুয়াশা চাদর মুড়ি দিয়ে শীত নামত আর আপন তার বাবার হাত ধরে সাত সকালে মর্নিং ওয়াকে বের হতো। জন্মমাসে জন্মদাতাকে হারিয়েছে আপন আর তার সাথে হারিয়ে ফেলেছে মাথার উপর হাতের ছায়া, হারিয়ে ফেলেছে গুছিয়ে চলা সেই পথ যে পথে বাবার হাত ধরে নির্ভয়ে হেঁটে যাওয়া যেত নিশ্চিন্তে। তাই এখন এই মাস মিশ্র অনুভূতির মাস। মানুষ যত বড় হতে থাকে ততই হারাতে থাকে সবকিছু। চুল, স্বাস্থ্য, দাঁত বা চোখের দৃষ্টি, সাথে সাথে হারাতে থাকে প্রিয়জন। এভাবে হারাতে হারাতে নিজেই একদিন হারিয়ে যায়। যেমনটা হারিয়ে যাচ্ছে ছয় ঋতু, বর্ষার মৌসুম বা শীতের সকাল। 


তারপরও সবকিছু পরিবর্তনশীল আর তাই জগতের নিয়ম। পরিবর্তন এর সাথে তাল মিলিয়ে নিজেকে অভিযোজন ক্ষমতা সম্পন্ন করে তুলতে পারলেই এগিয়ে যাওয়ার পথ খুলে যায়। তবে সবাই এই যুদ্ধে এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা চালায় না, কিছু মানুষ ইচ্ছা করেই পিছিয়ে থাকে আর তার কারণেই হয়তবা অনেক মানুষ এগিয়ে যাওয়ার পথ খুঁজে পায়। 


একটা সিগারেট টানতে টানতে টুপটাপ বৃষ্টির ফোঁটা গায়ে মাখিয়ে আপাতত যাপিত জীবনের পথে নিরন্তর হাটতে লাগল সে। সিগারেট এর ধোয়া কুয়াশার উপস্থিতি ঘুচিয়ে দিচ্ছে ক্ষণিকের জন্য। ভালোই লাগছে। 

Comments

Popular posts from this blog

খামবন্দী মুহূর্ত

তোলা থাক মান-অভিমান, তোলা থাক বাক্সবন্দি কিছু স্বপ্ন, তোলা থাক রাজ্য জুড়ে তোমার নামে বয়ে যাওয়া মাতাল হাওয়া, তোলা থাক মরীচিকার বুকে ভেসে ওঠা তোমার অস্তিত্ব। তোলা থাক কলম, ফুরিয়ে যাক কালি, তোমার নামে লেখা ছোটগল্প, খামবন্দী চিঠির সারি। তোলা থাক গায়ে গা লাগানো, জ্যাম ঠেলে ছুটে চলা রিকশা, তোলা থাক অসমাপ্ত গানের লাইন, চোখে জমে থাকা নির্বাক কথামালা। তোলা থাক রাস্তার মোড়ে একটি নামের প্রতিধ্বনি— যেখানে সময় থমকে দাঁড়ায় তোমার অপেক্ষায়। তোলা থাক সবকিছু, তোলা থাক— যতদিন না জেগে ওঠে ঘুমন্ত শহর তোমার পদধ্বনিতে।

আপনের দিনগুলি

  (তৃতীয় পর্ব) রাত অনেক, প্রচণ্ড শীত বাইরে। কনকনে শীতল হাওয়া বইছে। ঘুম আসছে না আপনের চোখে। বাসার নীচে, কাছাকাছি কোথাও হতে ট্রাক থেকে ইট নামানোর শব্দ কানে ভেসে আসে। এই শহর কখনো নীরব হয়না, রাতেও না। এই শহরের দেওয়ালগুলো কখনও নীরব শান্তির স্বাদ আস্বাদন করতে পারেনা। বিরামহীন শব্দের ভারে শ্রান্ত তাদের দাঁড়িয়ে থাকা। মাঝখানে ক’দিনের জন্য গ্রামের বাড়ি গিয়েছিলো সে। সেখানেও শীত ছিলো তবে শহরের মতো কোলাহল ছিলো না। আর কোলাহল এর অভাবে সেখানে শীতের মাত্রা আরও ভারী, নিঃশব্দের মাত্রা আরও প্রকট। টিনের চালে গাছের পাতা থেকে ঝরে পড়া শিশিরের শব্দ কানে আসত। কখনও দূর থেকে শিয়ালের ডাক, আর সেই ডাকে হঠাত জেগে উঠা গৃহে পালিত হাঁসের ভয় পাওয়া আর্তনাদ। ঘুম জড়িয়ে আসত চোখে।  আজ আপনের চোখে ঘুম নেই। তরীর কথা মনে পড়ছে না তো? তরীর কথা মনে না পড়লেও, স্মৃতিগুলা মনে হয় এই শীতের রাতেও লেপের উষ্ণতা নিয়ে ভর করতে চায় তার উপর। বিছানা ছেড়ে সিগারেট নিয়ে বারান্দায় গিয়ে গ্রীলের বাইরে চোখ রাখল আপন।  এভাবেই দিনের সাথে সাথে রাত কেটে যাচ্ছে তার। কিছুটা ঘোরের মধ্যে, কিছুটা ঘোরের বাইরে। বাসা থেকে অফিস, অফিস থেকে বাসা। ম...

আপনের দিনগুলি

  শীত শেষ। দিন দশেকের কাপুনিতে শীত যেন তার সর্বস্ব দিয়ে গেছে। এখন যা আছে বা যা অনুভূত হচ্ছে, তা হলো শীতকে জিইয়ে রাখার এক অদ্ভুত তাড়না। একসময় Winter is coming বললে একটা গম্ভীর আবহ তৈরি হতো। এখন গরমকাল আসার কথাতেই মানুষের হৃদয় কেঁপে উঠে। যেমনটা আজকাল প্রায়ই কেঁপে উঠে, ঘুমের মধ্যে কিংবা জেগে থাকতেই হঠাৎ করে বিল্ডিং কেঁপে উঠে; ইদানীং ভূমিকম্প হচ্ছে খুব।  গরমকাল মানেই এখন প্রচণ্ড গরম।  উত্তপ্ত চুলার ওপর ভাত যেমন ফটফট শব্দে ফুটতে থাকে, গরমের দিনে শরীরটাও তেমনই সিদ্ধ হতে থাকে। পার্থক্য শুধু এই, এখানে শব্দ শোনা যায় না। সবকিছু ভেতরে ভেতরে ঘুমরে থাকে। ফেব্রুয়ারি মাস চলে এলো। বারো মাসের এক বছরে এই মাসটা আপনের বরাবরের পছন্দের। প্রথমত, মাসটা ছোট। দ্বিতীয়ত, এটা ভালোবাসার মাস, যুগলবন্দী হবার মাস, সরস্বতী পূজার মাস, ভাষা শহীদের মাস, বইমেলার মাস। আর তরীর সঙ্গে প্রথম দেখা হওয়ার মাসও বটে। কিন্তু এই বছরটা কেমন যেন ব্যতিক্রম। শুভ পঞ্চমীর তিথি জানুয়ারিতে পড়ে যাওয়ায় ফেব্রুয়ারি আর সরস্বতী পূজার মাস হলো না। বইমেলাও হচ্ছে না। আরও অনেক কিছুই যেন হলো না। এই মাসটা ক্রমে ‘না-হবার মাস’ হয়ে উঠছে...