Skip to main content

বিচ্ছিন্ন আলাপ- ৩

দেখতে দেখতে অবশেষে শীত আসছে এই শহরে। যে শীত সাধারণত অক্টোবরের শেষ দিকে এসে জানান দিতে শুরু করে, সে শীত এখন নভেম্বরের শেষ প্রান্তে এসে নিজের অস্তিত্ব জানান দিচ্ছে। প্রকৃতির এই পিছিয়ে পড়া যেন আমাদের জীবনকেও এক অদৃশ্য নিয়মে পিছিয়ে দিচ্ছে। আমরা সময়ের সাথে তাল মেলাতে পারছি না, বাস্তবতার সঙ্গে নিজেদের খাপ খাইয়ে নিতে পারছি না। আর সেই অক্ষমতার ভারে আমাদের মন ভারাক্রান্ত হয়, ছোট ছোট হতাশার ঢেউ এসে হৃদয়কে আন্দোলিত করে।


যাপিত জীবন এখন শীতের সকালের মতো—কুয়াশায় ঢাকা, ধূসর। সম্ভাবনার সোনালি আলো ক্রমশ ম্লান হয়ে যায়। দিন দিন চাওয়ার তালিকা ছোট হয়ে আসছে, আর সেই সঙ্গে সংকুচিত হচ্ছে চলার পথও। পরিচিতজনেরা দূর-দূরান্তে নিজেদের জীবনের আলো খুঁজে নিয়েছে। আর আমি? নিজের আয়নায় প্রতিফলিত চিত্র দেখে মনে হয়, এক জীবনযুদ্ধে পিছিয়ে পড়া অগোছালো সৈনিক।


তবুও এই হতাশার কালো মেঘের ভেতরেই কোথাও একটা আশা সুপ্ত অবস্থায় লুকিয়ে থাকে। মনে হয়, জীবন তো একটা চলমান নদীর মতো—একে আক্ষেপ আর হতাশার আশায় থামিয়ে রাখা যায় না। শীতের সকাল যেমন বিবর্ণ, তবু তা দুপুরের রোদে আলোকিত হয়। আবার সেই আলো হারিয়ে বিকালের ঠান্ডা ছুঁয়ে, শেষে রাতে মিলিয়ে যায়। প্রকৃতির এই নিয়মে প্রতিটি দিন এগিয়ে যায়, আমাদের জীবনও তাই।


সে যাই হোক নীরবে নিভৃতে দেশের মধ্যে একটা গৃহ গ্যাঞ্জাম চলছে, ক্ষমতার অপব্যবহার আর বিকৃত মানসিকতার আন্দোলনে পথ-ঘাট রুদ্ধ হয়ে আছে। আর এই রুদ্ধ থাকা পথে গাড়ির মধ্যে জ্যামে আটকা পড়ে জীবনের কোন দ্বার খুলে—এই দেশ থেকে পালিয়ে যাওয়ার কোনো পথ আছে কি? কিন্তু পরক্ষণেই ভাবি, সাহস করে পিছুটান ভুলে চলে গেলে কি জীবনের কাছে নিজেকে আবরণবিহীন দাঁড় করানো সম্ভব? আর আবরণবিহীন অবস্থায় মানুষ বড় অসহায়।


তবুও, জীবনের নিয়ম মেনে এগোতে হবে। শীতের সকালের বিবর্ণতা চিরস্থায়ী নয়। হতাশার কুয়াশা একসময় কাটবে, সূর্যের আলো উঁকি দেবে। গুছিয়ে নেওয়ার চেষ্টার মধ্যেই জীবনের মানে। হয়তো এই শীতের পরেও বসন্ত আসবে—নতুন সূর্যোদয়ের প্রতীক্ষায় নিজের ভেতরের আলো জ্বালিয়ে রাখতে হবে।

Comments

  1. আপনার লেখায় বাস্তবতাকে খুজে পাওয়া যায়।

    ReplyDelete

Post a Comment

Popular posts from this blog

খামবন্দী মুহূর্ত

তোলা থাক মান-অভিমান, তোলা থাক বাক্সবন্দি কিছু স্বপ্ন, তোলা থাক রাজ্য জুড়ে তোমার নামে বয়ে যাওয়া মাতাল হাওয়া, তোলা থাক মরীচিকার বুকে ভেসে ওঠা তোমার অস্তিত্ব। তোলা থাক কলম, ফুরিয়ে যাক কালি, তোমার নামে লেখা ছোটগল্প, খামবন্দি চিঠির সারি। তোলা থাক গায়ে গা লাগানো, জ্যাম ঠেলে ছুটে চলা রিকশা, তোলা থাক অসমাপ্ত গানের লাইন, চোখে জমে থাকা নির্বাক কথামালা। তোলা থাক রাস্তার মোড়ে একটি নামের প্রতিধ্বনি— যেখানে সময় থমকে দাঁড়ায় তোমার অপেক্ষায়। তোলা থাক সবকিছু, তোলা থাক— যতদিন না জেগে ওঠে ঘুমন্ত শহর তোমার পদধ্বনিতে।

আপনের দিনগুলি

  (তৃতীয় পর্ব) রাত অনেক, প্রচণ্ড শীত বাইরে। কনকনে শীতল হাওয়া বইছে। ঘুম আসছে না আপনের চোখে। বাসার নীচে, কাছাকাছি কোথাও হতে ট্রাক থেকে ইট নামানোর শব্দ কানে ভেসে আসে। এই শহর কখনো নীরব হয়না, রাতেও না। এই শহরের দেওয়ালগুলো কখনও নীরব শান্তির স্বাদ আস্বাদন করতে পারেনা। বিরামহীন শব্দের ভারে শ্রান্ত তাদের দাঁড়িয়ে থাকা। মাঝখানে ক’দিনের জন্য গ্রামের বাড়ি গিয়েছিলো সে। সেখানেও শীত ছিলো তবে শহরের মতো কোলাহল ছিলো না। আর কোলাহল এর অভাবে সেখানে শীতের মাত্রা আরও ভারী, নিঃশব্দের মাত্রা আরও প্রকট। টিনের চালে গাছের পাতা থেকে ঝরে পড়া শিশিরের শব্দ কানে আসত। কখনও দূর থেকে শিয়ালের ডাক, আর সেই ডাকে হঠাত জেগে উঠা গৃহে পালিত হাঁসের ভয় পাওয়া আর্তনাদ। ঘুম জড়িয়ে আসত চোখে।  আজ আপনের চোখে ঘুম নেই। তরীর কথা মনে পড়ছে না তো? তরীর কথা মনে না পড়লেও, স্মৃতিগুলা মনে হয় এই শীতের রাতেও লেপের উষ্ণতা নিয়ে ভর করতে চায় তার উপর। বিছানা ছেড়ে সিগারেট নিয়ে বারান্দায় গিয়ে গ্রীলের বাইরে চোখ রাখল আপন।  এভাবেই দিনের সাথে সাথে রাত কেটে যাচ্ছে তার। কিছুটা ঘোরের মধ্যে, কিছুটা ঘোরের বাইরে। বাসা থেকে অফিস, অফিস থেকে বাসা। ম...

প্রতীক্ষা

  আমি দাঁড়িয়ে আছি, ঠিক সেখানেই যেখানে তুমি শেষবার দেখে গিয়েছিলে। নড়বড়ে মন তোমার— কাছে আসো, আবার ক্ষণিকেই দূরে সরে যাও। এমনটা কি ঠিক হবার ছিল? তুমি হয়তো হেঁটে যাবে সেই পথেই, হয়তো এড়িয়ে যাওয়ার গল্প আরও ভিড় জমাবে। হয়তো স্মৃতিগুলো অপুষ্টিতে ভুগবে, ঘুরে ফিরবে রাস্তায় রাস্তায়— এক মুঠো সময়ের জন্য। সে সময় হবে কি তোমার?