সকাল থেকেই মাথার ভেতর কেমন একটা অদ্ভূত অনুভূতি কাজ করছে আপনের। গতরাতে তরীকে স্বপ্নে দেখেছে আর ঘুম থেকে উঠার পর তরীর মুখই কেবল ভাসছে অথচ স্বপ্নে কি দেখেছে সেটা ঠিক মনে করতে পারছে না। তাই মনের মধ্যে একটা খুচখুচানি কাজ করছে। সকালের আকাশটা মেঘে ঢাকা, পাশের বাসার ছাদের উপর দুটি চড়ুই আপন মনে ঝগড়া করছে। এই শহরের এই দিকটা খুব অদ্ভূত, খুব কাছাকাছি বাসা হওয়াতে মানুষের ঝগড়া যেমন দেখা যায় তেমনি চোখে পড়ে পাখিদের ঝগড়া তবে মানুষের ঝগড়া সুন্দর না যেমনটা সুন্দর পাখিদের ঝগড়া। আজকে বৃষ্টি হবে, বাইরের ঠান্ডা বাতাসে আর ট্যাপের ঠান্ডা জল সেই ইঙ্গিতই দিচ্ছে। স্নান সেরে রেডি হচ্ছে আপন। সকাল সকাল স্নান করলে সারাদিন আর ক্লান্তি ভর করেনা। শরীরটা কেমন হালকা হালকা লাগছে তবে মাথার মধ্যে এখনো খুঁজ চলছে স্বপ্নে কি ঘটেছিলো। আজকে অফিসে কাজ নেই তবে অফিসের কাজে বঙ্গবন্ধু আন্তর্জতিক সম্মেলন কেন্দ্রে যাবে সে। অফিসের তত্ত্বাবধানে সেখানে একটা অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে। তাকে কোঅরডিনেট করতে হবে অনেক কিছু। একটা সাদা শার্ট আর ধূসর রঙা প্যান্টে মনের সেই খুচ্খুচানি বয়ে নিয়ে বেরিয়ে গেলো সে।
বাইরে বেরুতেই হালকা শীতল বাতাস গায়ে মাখলো। আকাশ ভরা ধূসর মেঘে, কোথাও বৃষ্টি হচ্ছে। শীতল বাতাসে সেই বৃষ্টির গন্ধ পেলো আপন। পরিবেশটা তার ভালোই লাগল। অফিসের গাড়ি অপেক্ষা করছে তার জন্য। একটু এগিয়ে যেতেই গাড়ির দেখা পেলো সে। তার কলিগ এখনও এসে পৌঁছায় নি। সময়টা কাটানোর জন্য একটা চা আর সিগারেট নিয়ে গুমড়া মুখো আকাশ দেখতে লাগল সে। একটা ধূসর কালো ক্যানভাস মনে হলো আকাশটাকে যার মধ্যে শিল্পীর আঁচড়ে মেঘগুলো জীবন্ত হয়ে এদিক ওদিক ছড়াছড়ি করছে। এই বিশাল ক্যানভাসে তরীর সেই লুকানো হাসিমুখ ভেসে উঠেছিল। স্বপ্নে তরী সুখী ছিল কিন্তু কি ঘটেছিলো এখনও কিছু মনে করতে পারলো না সে। ল্যামপোস্টে একটা কাক একা বসে আছে। সুন্দর একটা ফ্রেম। চা বিড়ি শেষ করে একটা ছবি তুলে নিলো সে। তারপর রওনা দিলো সম্মেলনের কেন্দ্রের দিকে। রাস্তায় জ্যাম না থাকার কারণে খুব দ্রুতই তারা সেখানে পৌঁছে গেলো। বিশাল এলাকা জুড়ে এই সম্মেলন কেন্দ্রের অবস্থান। আগে একবার স্কলারশিপের টাকা নিতে এসেছিলো সে। কিন্ত তখন এটা এত সুন্দরভাবে গুছিয়ে উঠতে পারেনি।
কিছুক্ষণ আগের আকাশে জমা মেঘ কেটে গেছে। হুট করে সোনালী দিনের আভাস চারদিকে। ধূসর সময় কেটে গিয়ে আকাশে এখন নীলের দাপট কিন্তু হুট করে পরিবেশ বদলের কারনটা ঠিক তখনও আপনের কাছে ধরা দেয় নি। এইখানে এই ফাঁকা পরিবেশ ঢাকা শহরে বিরল। এইখানে বিশাল আকাশ চোখে পড়ে। আর মাথার উপর আকাশের নীল সমুদ্র। ভালো লাগছে তার এই পরিবেশ। কিন্তু সেই খুচ্ষুচানি এখনও তার সঙ্গে।
আজকে তার মিডিয়া আর স্টল ম্যানেজমেন্টে থাকার কথা। তবে এখনও অনুষ্ঠান শুরু হতে অনেক সময় বাকি। তাই সহকর্মীদের সাথে আড্ডা আর ছবি তুলে কাটিয়ে দিচ্ছিলো সময়। ছবি তুলতে বরাবরই তার ভালো লাগে তাই হাতে ক্যামেরা নিয়ে কলিগদের ছবি তুলে দিচ্ছে সে। আর ঠিক তখনই একটা পরিচিত মুখ অনেকদিন আগে দেখা সামনে এসে উপস্থিত। আপনের ভার্সিটির ছোট ভাই তাহসিন কিন্তু এখানে সে কেনো? আপনের মনে একটু খটকা লাগলো।
: ভাই কেমন আছেন?
: ভালো। তুই কেমন? অনেকদিন পর দেখলাম তোরে।
: ভাই আছি ভালোই। আপনারেও অনেকদিন পর দেখলাম।
: তা তুই এখানে কি কেনো?
: এক্সপো হচ্ছে যে ওইটাতে আমাদের একটা স্টল আছে। টিমের সাথে এসেছি।
তাহসিন এর সাথে আপনের ভার্সিটি চলাকালীন সময়ে তেমন পরিচয় ছিলো না। তবে তরী যেখানে জব করে সেখানে কথা প্রসঙ্গে তার নাম এসেছিলো। আপনের চিনতে অসুবিধা হয়নি কিন্ত এখন বুঝতে অসুবিধা হচ্ছে। তরীও কি তাইলে এই টিমের সাথে এসেছে? প্রশ্নটা সে তমালকে করতে পারেনি। তমাল চলে গেলো। কিন্তু প্রশ্নটা ফাঁকা হলে গম গম করতে লাগল। আপন একটু দ্বিধায় পড়ে গেলো। বুকের মধ্যে ধরফরানি হুট করে বেড়ে গেলো তার। কি করবে সে এখন, এগিয়ে সামনের দিকে যাবে না ঠাই দাঁড়িয়ে থাকবে ঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারছে না। গতকাল রাতে ঘটে যাওয়া স্বপ্নের কথা স্মরণ করার চেষ্টা করলো সে কিন্তু এখনও কিছু মনে আসছে না। আপন তাহসিন এর হেঁটে যাওয়া পথ ধরে সামনের দিকে এগিয়ে গেলো।
একটু এগিয়ে যেতেই দেখা গেলো একটা স্টলের ঠিক সামনের দিকেই তাহসিন তার টিমের সাথে দাড়িয়ে আছে। পাশে একজন সিনিয়র বয়স্ক লোক তাদের কাজ তদারকি করছে। তাহসিন এর সাথে পেছন করে দাড়ানো তিনটা মেয়ে। তাদের মুখ দেখা না গেলেও আপনের বুঝতে অসুবিধা হলো না যে তরী এসেছে এখানে। লম্বা ছাড়া চুল আর লম্বা অবয়বে তরীর উপস্থিত টের পেলো আপন। গত রাতের স্বপ্নের কথা মনে পড়ল তার। মনে করার চেষ্টা করল আপন। কিন্ত এবারও ব্যর্থ হলো সে। তরীকে দেখার জন্য এগিয়ে গেলো সে। দ্বিধার পা আর বুকের ধরফরানি দুইটাকে অগ্রাহ্য করে সামনে যাওয়া। যতোই সামনে যাচ্ছে স্বপ্নটা কেমন জানি সত্যি সত্যি হয়ে যাচ্ছে। এভাবেই স্বপ্নে সে হেঁটে এগোচ্ছিল তরীর দিকে। মুখ ফিরিয়ে বসে থাকা তরীর চুল দেখা যাচ্ছিলো। স্বপ্নে সে ঠিক এই তরীর মুখ দেখেছিলো। মুখ ফিরিয়ে লাজুক হাসি হেসেছিল। স্টলের সামনে দাড়িয়ে সে দেখে যাচ্ছিল তরীকে কিন্তু এই তরী তাকে দেখেও না দেখার ভান করে যাচ্ছে। এত অপরিচিত তো আপন কখনও ছিলো না তরীর কাছে।
: কি অবস্থা? ভালো আছেন?
তরী মনে হলো একটু বিব্রত। ভরা মজলিশে কতগুলো পরিচিত মুখের সামনে সে হয়ত আপনকে এভাবে আশা করেনি। কিন্ত আপনদের আয়োজিত অনুষ্ঠানে আপনকে সে দেখবে না সেটা মনে হয় সে নিজেও কল্পনা করেনি। তো প্রস্তুত হয়েই এসেছিলো সে। অস্বস্তির ভাবটা কেটে গেলো তার।
: এইতো ভালো আছি। আপনি?
: আমি ভালো নেই।
তরীর মুখটা একটু ফ্যাকাশে হয়ে গেলো।
আপন বলে উঠল -
: আপনি মনে হয় আমাকে দেখেও না দেখার ভান করছেন।
: তা করার তো কোন কারণ নাই। আর তা নাই সেটা আপনিও জানেন।
: জানি কিন্ত মেনে নিতে পারিনা।
: আমি চোখে কম দেখি, আপনি আমার চোখের দৃষ্টিসীমার মধ্যে নাই। তাই আপনাকেও দেখি নাই।
; চোখের আড়ালে রাখলেই কি মনের আড়ালে রাখা যায়। যাই হোক।
আপনাকে এইভাবে এইখানে আশা করিনি। তবে আপনার উপস্থিতি ভালো লাগছে আমার।
: আমার জন্য ব্যাপারটা বরং উল্টা। আমি বিব্রত।
আপন একটু কষ্ট পেলে পেতেও পারত বা বলা যায় তার একটু অভিমান হলো।
: আচ্ছা। স্বাগতম আপনাকে আমাদের এই আয়োজিত অনুষ্ঠানে।
আপন তরীর দাঁড়িয়ে থাকা স্টল ছেড়ে এগিয়ে গেলো সামনের দিকে। কেমন একটা অস্থিরতা চারপাশ জুড়ে। কেমন করে বদলে যায় সময়। তরীর দেখা সারাদিন মিলবে বলে মন যেমন পুলকিত হয় আবার সামনে থেকেও কথা হবে না তা ভেবে মনের মধ্যে হতাশা বাড়ে। সারাটা দিন এমনই গেলো আপনের। তরীকে এদিক ওদিক অনেকদিকেই দেখেছে আপন দিনব্যাপী। কিন্তু সাহস হয়ে উঠেনি সামনে গিয়ে কথা বলার। অস্থিরতার মধ্য দিয়েও দিন গেলো, রৌদ্র নিবে বৃষ্টি হলো কিন্তু আপন হালকা হতে পারেনি। তরী এসেছিলো তার ভাইকে নিয়ে। কিন্তু আপন তারপরও সহজ হতে পারেনি সেদিন। স্বপ্ন আর বাস্তব মিলে সেদিন যুদ্ধ হলো, ঝড় হলো, বৃষ্টি হলো তারপর আবার রোদ হাসল। কিন্তু আপন তরীর সামনে থেকেও বাস্তবে দূরে ছিলো কিন্তু স্বপ্নে সে কাছে এলো কেনো?
...........ঠিক এক বছর পর ঠিক এইখানে আরেক অনুষ্ঠানে সেইদিনের কথা মনে পড়ে আপনের মনে আবার হতাশা বাড়ে।বছর বাড়ে কিন্তু হতাশা কমে না। কি হতে পারত আর কি হয়ে উঠা হয় নি তা ভাবতে ভাবতেই বিকাল গড়িয়ে সারাদিনের সূর্যের তেজ একটু ঠাণ্ডা হয়, পশ্চিম কোণে সমান্তরালে দাঁড়িয়ে থাকা গোল কমলার মত সূর্য আস্তে আস্তে ডুবে যায়। সন্ধ্যা নামে তার সাথে সাথে বেজে উঠে জলের গান “এমন যদি হতো আমি পাখির মতো, উড়ে উড়ে বেড়ায় সারাক্ষণ।” সেদিনের সন্ধ্যায়ও আপনের মনে একটা পাখির দুটি ডানার ভর চেপেছিল। সে উড়ে গিয়েছিলো তরীর দিকে হাতে করে ফুলের ছোট্ট একটা তোড়া নিয়ে।
সেদিনের সেই আপনের দেওয়া চোখের ঈশারা আর তরীর দেওয়া রেসপন্স এখনও মনে পড়ে আপনের। সে চোখের ঈশারায় তরীকে ভরা মজলিস ছেড়ে একটু বাইরে বেরিয়ে আসার আভাস দিয়েছিলো আর তরী তা অনুসরণ করে বেরিয়ে এসেছিলো বাধ্যগত মেয়ের মতো। নিস্তব্দতার মধ্যে লুকিয়ে থাকা শব্দ যে বুঝে তাকে কেনো বলে বুঝাতে হয় দূরে থেকে ভালো না থাকার চাইতে কাছে এসে খারাপ থাকা ভালো। একটু এগুতেই সাথে করে নিয়ে আসা সদ্য বানানো ফুলের তোড়া সে এগিয়ে দিয়েছিলো তরীর দিকে।
: আমি এই ফুল নিতে পারব না। আমার বিয়ে আগামী মার্চে। আপনার দাওয়াত।
খুব সহজ করে কঠিন কথাটা সেদিন তরী বলে ফেলেছিল। আর বলে চলেও গিয়েছিলো। সদ্য বানানো ফুলের তোড়া ছুড়ে ফেলে দিয়েছিলো আপন। কিন্তু সেই রাগ থাকেনি, ফেলে দেওয়া ফুল কুড়িয়ে, নতুন কিছু ভুল জমিয়ে ফিরে গিয়েছে সে। তারপর তরীকে আর দেখেনি সে।
তো জলের গান পেরিয়ে শেষ বেলার গান কানে আসছে আপনের। তিনদিন ধরে চলা অনুষ্ঠান এর আজকে সমাপ্তি। এই স্থান আর সেদিনের সেই কাল একসাথে মিশে বহুকাল হয়ে গেছে কিন্তু সেই স্বপ্নে কি দেখেছিল আপন এখনও সে খুঁজে ফিরে।
দূরে থেকে ভেসে আসছে গান:
“কার কপালের টিপ কার কপালের টিপ
কার হয়ে যায়
চলে গিয়ে ভুল করেছে
ভুল করে সে ফুল হয়ে যায়
ভুল করে সে ফুল হয়ে যায়
সে আমারে আমার হতে দেয় না।"
Comments
Post a Comment