তো সবারই কি এমন হয় যে একটা বই পড়া শেষ করার পর তার প্রভাবে কিছুকাল মন প্রভাবিত থাকে, বা কাহিনির আবেশ দ্বারা আবেশিত হয়ে থাকে আশপাশ? হইতে পারে। এটা একটা কমন সিনড্রোম, যারা বই পড়ে তাদের মধ্যে তা কম বা বেশী কাজ করেই। আপনেরও এমন লাগে আর 'Love In The Time of Cholera' উপন্যাস শেষ করে আজকেও এমন লাগছে তার। সদ্য পড়া বই ক্ষান্ত দিয়ে শান্ত হয়ে ঠিক বসে থাকতে পারছে না সে কেনোনা বারবার চিন্তার রাজ্যে ঘুরেফিরে ফিরে আসছে কিছু কথা, কিছু মহূর্ত বা তাদের সমিষ্টিক প্রভাবে ভেসে আসছে কিছু মুখ। মনে হয় বইয়ের সত্যিকারের প্রভাবটা এইদিকেই অনন্য। বই আলো দেয়, আলোকিত করে আর সেই আলোয় পরিচিত হয়ে উঠে অনেক অপরিচিতি। পড়তে পড়তে অনেক সময় বইয়ের গল্প আর নিজের গল্প কখন কোন কালে এক তালে মিশে যায় বলা কঠিন। তো তার সাথে কোথাও কি কোন জায়গায় মিল খেয়েছে গল্পের না এটা ফ্লোরেন্তিনো আরিজার মতোই অবসেসিভ মননের একরোখা অনুভতি যা তার সোনালী দিনকেও কিছুটা বিবর্ণ করে রেখেছে। বলা মুশকিল।
তাই বই পড়তে ভালো লাগে তার। কিছু বুঝুক বা না বুঝুক; ব্যাখ্যা করতে পারুক বা না পারুক সে শুধু পড়ে যায় আর একটা অপরিচিত দৃশ্যপটকে আস্তে আস্তে নিজের চিন্তারাজ্যে বেড়ে উঠতে দেয়। পরিচিত হয় নতুন নতুন শব্দের সাথে, নতুন মানুষ, নতুন সংস্কৃতি আর সংস্কারের সাথে। তো গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেজ এর বই এমনিতেই কঠিন বা আরও সহজ করে বললে বলা যায় কঠিন বইয়ে প্রেমের ভাষা দোদুল্য বাতাসে দুলদুল করে দুলে। যারা ধরতে পারে তারা বুঝতে পারে বা তাদের ভালো লাগে আর যারা পারেনা তারা বলে "only regret I will have in dying is if it is not for love.” আপনের মনও কি তাই বলে?
নামের মতোই দেখতে খটমট এই কলম্বিয়ান ভদ্রলোকের বাহিরটা কঠিনতর দেখা গেলেও ভেতরে তার রস ভারী আর এই রস দিয়েই লেখক তার লেখা তৈরি করে, রস ঢেলে রচনা করেন ভালোবাসাময় পরিবেশের গল্প আর উনার গল্পে পরিবেশের বিস্তৃতি একটু কম কেননা ছোট্ট একটা পরিবেশের মধ্যেই কিছু পরিবার নিয়ে আর তার মধ্য থেকে কিছু চরিত্র বিশেষভাবে উপস্থাপন করে জীবনের গল্প বয়ে নিয়ে চলেন তিনি। তো প্রেম থাকে মুখ্য বিষয় সাথে চলে সমাজ আর সংঘর্ষ। আর এভাবেই গড়ে উঠে মেনে আর মানিয়ে নেওয়ার গল্প, বাকি সব গল্পের মতোই। উনার বইয়ের আরেকটা বিশেষত্ব হলো এই যে উনার রচিত কল্পে চরিত্রের নামগুলা উনি খুব সুক্ষ্মভাবে উপস্থাপন করেন। Hundred years of solitude বইয়ে বুয়েন্দিয়া কেন্দ্রিক নাম এবং এই বইয়ে ফার্মিনা ডাজা, ফ্লোরেন্তিনো আরিজা নামের বাহারে ও প্রকাশে পরিবেশ একটু ভারী ভারী লাগে; আর থাকে ভরা যৌনতা যদিও ভালোবাসার গল্পে যৌনতা একটা স্বাভাবিক ব্যাপার।
তো সব গল্পেই স্তর থাকে, সমাজের তৈরি করা স্তর, যে স্তর ভেদ করে সবসময় সবকিছু জয় করা যায়না কিন্তু লেগে থাকলে পরে অজেয়ও থাকেনা কিছু। এই স্তর বৈষম্য তৈরি করে, সমান তালে সমান আবেগ এই স্তরের প্রভাবেই একসাথে মাঝে মাঝে প্রবাহিত হতে পারেনা, আবার একা একা বেশী দূর তারা যাইতেও পারেনা। ফ্লোরেন্তিনো আরিজা পারেনি বা পারেনি ফারমিনা ডাজাও। তো সেই সমাজের বড় লোকের মেয়ে ছিলো ফারমিনা, এই সমাজ হইলে বলা যেত ব্রাহ্মনের বা বড়লোকের মেয়ে। সমাজ সচেতন, সচকিত সবলা কিশোরী যে ফ্লোরেন্তিনো আরিজাকে গ্রহণ করেও গ্রহণ করতে পারেনি, স্মৃতি থেকে মুছে ফেলতে চেয়েও পুরোপুরি রূপে তার প্রভাব থেকে মুক্ত থাকতে পারেনি। আর গ্রহণ করতে পারেনি বলেই সচেতন মনে বিয়ে করেছিলো সমাজ স্বীকৃত স্বামী ডাক্তার আরবিনো কে আবার মুছতে পারেনি বলেই সেই স্বামী গত হবার পর ফ্লোরেন্তিনো আরিজার প্রভাবে প্রভাবিত হয়ে গিয়েছিল সে।
অন্যদিকে ফ্লোরেন্তিনো আরিজা ছিলো গরীব ঘরের গরীব মায়ের একমাত্র সন্তান। দেখতে কুৎসিত বা অযোগ্য না হলেও অবিচল মনেই সে নিজের নিয়তি বেঁধে নিয়েছিলো ফারমিনো ডাজার সাথে।
“He allowed himself to be swayed by his conviction that sooner or later she would be his, because he had been born for her and she for him, and that no power on earth was greater than the love he felt for her.”
ফারমিনো ডাজার সচেতন মনে নেওয়া সিদ্ধান্তের প্রতিবাদ সে করেনি, সে শুধু শিখেছে ভালোবাসতে কিন্ত আদায় করা তার হয়ে উঠেনি। কেমন একটা টিমিড ভাব ছিলো সর্বদা তার মধ্যে আর তাই হয়ত গল্পের নায়িকার নায়ক হতে তার সময় লেগেছিলো পাঁচ দশকের বেশী সময়। আর সেই সময়ে ফারমিনা ছিলো তার জীবনের ছায়া কেন্দ্রবিন্দু যেই বিন্দু কেন্দ্রে থেকে তার জীবনের পরিসীমা নির্ধারণ করে গেছে, আর যাকে ছাড়া সে আর কাউকে বিয়ে করবে না বলে স্থির করে। এভাবেই আবডালে থেকে নিজেকে আড়ালে রেখে আর নানা নারীর অবয়বে সে খুঁজে গেছে ফারমিনা ডাজার মুখ, অপেক্ষা করে গেছে সে তার জন্য।
তিপ্পান্ন বছর সাত মাস এগার দিনের পর তার অপেক্ষা অবশেষে গুচেছিলো। নানান কালের তাপ, বাতাস গায়ে মাখিয়ে, তাজা চামড়া শীর্ণ করে একান্তে আসতে পেরেছিলো তারা। আসলে এমনই হয় সব সমাজেই। সমাজ দ্বারা সৃষ্ট পরীক্ষার খাতায় উত্তীর্ণ হতে না পেরে কিছু মানুষ আশ্রয় নেয় স্মৃতি ধরে বেঁচে থাকার। হয়ত সময় বাড়ার সাথে সাথে কারো মধ্যে কিছু মুহূর্ত হারিয়ে যায়, এটাই স্বাভাবিক নিয়ম, তারপরও কিছু মানুষ থাকে যারা বসে থাকে, বেঁচে থাকে স্মৃতি নিয়ে আর তখন তাদের একগুঁয়ে বলা হইলেও হতে পারে কিন্তু তারপরও তারা ব্যতিক্রম কেননা তারা সমাজের শিকল ভাঙার আন্দোলনে নামা সংগ্রামী সৈনিক। ব্যতিক্রম হওয়া কঠিন কাজ যেমনটা হওয়া কঠিন ফ্লোরেন্তিনো আরিজা।
বইটা আপনের যে খুব ভালো লেগেছে ব্যাপারটা তেমনও না। কিন্তু অপরিচিত জায়গায় যদি পরিচিত জীবনের গল্পের গন্ধ থাকে তাহলে সেখানে পড়ে থাকার আগ্রহ বাড়ে, বাড়ে অপরিচিত গল্পটা কিভাবে শেষ হবে তা জানার। গল্পে ফ্লোরেন্তিনো কে অনেক জায়গাতে পার্ভাট হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে, তার এক জীবনে ছয়শ বাইশ জন নারীর সাথে সঙ্গমে লিপ্ততাকে একটু বেশী ভাবেই উপস্থাপন করা হয়েছে। তারপরও কিছু জায়গায় সেই দোষ কাটাতে হয়ত এক নারী মুখে তাকে নিয়ে বলতে শোনা যায়-
“Although she never even hinted at it, she would have sold her soul to the devil to marry him. She knew that it would not be easy to submit to his miserliness, or the foolishness of his premature appearance of age, or his maniacal sense of order, or his eagerness to ask for everything and give nothing at all in return, but despite all this, no man was better company because no other man in the world was so in need of love. But no other man was as elusive either, so that their love never went beyond the point it always reached for him: the point where it would not interfere with his determination to remain free for Fermina Daza."
সে নিজেকে স্বাধীন রেখেছিলো ফারমিনা জন্য। আর শেষ মুহূর্তে এসে দাঁড়িয়ে ফারমিনাকে পাওয়া যায় -
“.....sat motionless until dawn, thinking about Florentino Ariza, not as the desolate sentinel in the little Park of the Evangels, whose memory did not awaken even a spark of nostalgia in her, but as he was now, old and lame, but real: the man who had always been within reach and whom she could never acknowledge. As the breathing boat carried her toward the splendor of the day’s first roses, all that she asked of God was that Florentino Ariza would know how to begin again in the next day."
আর এভাবেই এক দিন করতে করতে অনেকদিন পরে শেষ বেলার বয়সে এসে জীবনের গোধূলি লগ্নে তারা হাত বাড়িয়ে দেয় একে অপরের দিকে, মুট করে একে অপরকে জড়িয়ে ধরে তারা গুচাতে চায় মাঝখানের হারিয়ে ফেলা কত সময়। সচেতন মনের আড়াল থেকে বেরিয়ে আসে ফারমিনো ডাজা, খোলসবিহীন ফ্লোরেন্তিনো আরিজা এসে সামনে দাঁড়ায়, এক হয় তারা, প্রবাহমান সময়ও তার প্রবাহ ক্ষণিকের জন্য স্থির রেখে তাদের হারানো সময়ের ক্ষতিপূরণ দিয়ে দেয় আর বলে দেয়
মিলনেই সার্থকতা, বিপরীতে বিরহ।
Comments
Post a Comment