Skip to main content

নাম না জানা কোন এক গল্প।

১৪ তারিখ, শুক্রবার। ছুটির দিনে কিছুটা ফাঁকা শহরে একা একা হাঁটছে আপন। শাখারি বাজারের সরু গলি দিয়ে যদিও হেঁটে যাওয়া খুব সহজ কাজ না তারপরও ছুটির দিন আর রোজার দিন হওয়াতে তার সাথে দেশের চলমান অস্থির পরিবেশে কেউ সুস্থিরভাবে বাইরে বের না হবার কারণেই হয়ত লোকজন এখানে এখনও কম।এই পরিস্থিতিতে হাঁটতে হাঁটতে একটা শাখা আর সিদুরের দোকানের সামনে দাঁড়াল আপন। ছোট্ট একটা দোকান কিন্তু সাজানো গুছানো আর সেখানে পরিপাটি সেজে বিশাল দাড়ির সমাহার নিয়ে দোকানের মালিক বসে আছে। লম্বা দাড়ির দিকে চোখ বুলাতে মনে হলো নানান রঙের বাহারে বাহারিত হইয়া আছে তার লম্বা দাড়ি। ঐতিহ্য কে ধরে আর ধারণ করে রাখার চেষ্টা, রঙের ঐতিহ্য, হোলির রং। কিন্তু প্রশ্ন হলো অনেক চাওয়ার পরেও কেউ কিছু ধরে রাখতে পারছে কি? আস্তে আস্তে হাত ফসকে কত কিছু বেরিয়ে যাচ্ছে সেই খেঁয়াল আছেই বা কজনের? 

সে যাই হোক এখানে না আসলে আজকে যে হলি ছিলো তা বুঝত না সে।  এখনও যে এই শহরে একটু রং মৃদু বাতাসে উড়ে বেড়ায় তা এখানে না আসলে ইনস্টার রিল দেখে বুঝে নিতে হত। চারদিকে সারা সকাল আর দুপুরের ব্যস্ত রং ক্লান্ত হয়ে ঝিমুচ্ছে এখানে সেখানে রাস্তায় বা রাস্তার পাশে জীর্ণ জানালার শিকে। কয়েকটা ছবি তুলে গ্যালারি তে রেখে দিলো সে। কালার থাকলে ছবি সুন্দর আসে, আর ছোট্ট পরিসরে সুন্দর এর সহজ পরিমাপ করা যায়। এই শাখারি বাজারে শেষ যেদিন সে এসেছিল সেদিনও সে একা ছিলো, তরী আসার কথা থাকলেও পরে সে আর আসেনি, ঠিক এভাবেই সে দূরে থেকে গেছে। আজকেও তার আসার কথা বা হয়ত সে এসেছেও কিন্তু এখন আপনের নিজেকে দূরে রাখার প্রচেষ্টা। 

তো শাখারি বাজারের শাখা দিয়েই কত মানুষ বাঁধা পড়ে যাচ্ছে কত বন্ধনে। তরীও হয়ত তার প্রিয় এই জায়গা থেকে তার বিয়ের শাখা আর সিদুর কিনেছে আর সিথীর ঠিক মাঝ বরাবর দিয়ে চলে গেছে সরু নদীর লাল রঙ্গা স্রোত। যে স্রোতে এক পাড়ের দুই মানুষ দুই  পাড়ে গেছে সরে। তাই এই জায়গার ভার আর প্রতিপত্তি বিশেষ রকম। বিয়ের সকল সামগ্রী এখানে পাওয়া যায়। এসব ভাবতে ভাবতে সময়ের খেয়াল হলো তার। ঘড়িতে এখন পাঁচটা বেজে চব্বিশ মিনিট। ঘন বসতির কারণে এখানে মনে হয় সন্ধ্যা একটু আগে আগেই চলে আসে। দুই একটা দোকানে সন্ধ্যা প্রদীপ জ্বলে উঠেছে ইতোমধ্যে। আরেকটু আগে আসলে ভালো হত। 

আজকে কেনো এসেছে সে? মাঝে মাঝে কিছু কাজ এমনিতেই করা হয়ে যায়। তার জন্য কারণ খুঁজতে গেলেও যা না গেলেও তা, উত্তর কোনখানেই নাই। বহুদিন পর বিদেশ থেকে তরীর আগমন দেশে। তরী যেদিন আসে সেদিনই কাকতলীয়ভাবে এই শহর ছেড়ে যায় সে। কথা হয় না, দেখাও হবে না এটাই প্রকৃত ব্যাপার হওয়া উচিত। আর সেটাই হচ্ছে, দুইজন কাছাকাছি পরিসীমার মধ্যে থেকেও লম্বা রেখা ছেদ টেনেছে। আসলে কাউকে বৃত্তের মাঝে বন্দী রেখে দেওয়ার মাঝে সুখ নেই; সুখ বৃত্তভেদী। 

হাতে তার আড়ং থেকে কিনা সাদা সিরামিকের পটে একটা ক্যাকটাস কিন্তু দুই মাথা নিয়ে। একই মূল থেকে দুইটা শাখা বেরিয়েছে, একটা সবুজ আরেকটা লাল। সবুজ যেমন আশা, লাল তেমনই যন্ত্রণা, এ যেন তারই জীবনের প্রতচ্ছবি। এইটা তরীকে দিতে পারলে ভালো হতো।  

এইখানে একটা কালী মন্দির আছে হুট করে মনে হলো তার। সেখানে গিয়ে মাথা ঠেকিয়ে প্রণাম করে কিছুক্ষণ স্তব্দ হয়ে বসে রইল সে। কিছু পরিবেশ থাকে এমন যেখানে কিছুক্ষণ থাকলে মনের অবস্থার একটা পরিবর্তন লক্ষ্য করা যায়, কঠিন পদার্থ তরলে পরিণত হয়, তারপর বায়বীয় হয়, হালকা হয়ে ঘুরতে থাকে চারপাশ। মনে মনে মনের অবস্থার এই পরিবর্তন উপলদ্ধি করলো আপন। চারদিকে ধূপের গন্ধ আর সে গন্ধে পরিচিত শরীরের একটা গন্ধ টের পেলো আপন। মনে মনে হেসে নিল সে। 

: ভালো আছেন? 

: এইতো। আপনি ভালো? 

: বেশ ভালো। আমাকে দেখতে এসেছেন? 

: দেখতে আসিনি তবে এভাবে দেখা হয়ে যাবে এই আশা ছিলো। কেনো আপনার ছিলো না? 

: বলতে পারব না। 

: সত্য কথা বলার চাইতে লিখা সহজ। সে যাই হোক নিন এটা আপনার জন্য। কিছুক্ষণ আগে ভাবছিলাম এটা আপনাকে দিতে পারলে ভালো হতো। 

: আমার ক্যাকটাস পছন্দ না। 

: তারপরও তো এই সাকুল্যান্ট এর মতোই মানিয়ে নিচ্ছেন নিজেকে সবকিছুর সাথে। 

: আমি আপনার কাছ থেকে কিছু নিতে চাই না। রেখে দিন এটা। 

: অনেক কিছু না চাইতেই ইতোমধ্যে নিয়ে গেছেন। এইটা নিলে তেমন কিছু হবে না। 

: কি নিয়েছি? 

: আপনাকে একটা চিঠি লিখব, সেখানে বলে দিবো নে।

: আপনার লেখা কোন চিঠিও আর পড়ব না। 

: আমারই দুর্ভাগ্য তাইলে। আপনি জানেন কিনা জানিনা আপনাকে নিয়ে লিখতে গেলে নাকি আমার লেখা ভালো হয়।

: আমি জানি। 

: যাক অবশেষে কিছু জানলেন। 

ঠোঁটের ঈশান কোণে হুট করে জুড়ে আসা হাসি লুকাতে  আপনের দিক থেকে একটু মুখ ফিরিয়ে নিলো তরী। মরীচিকার মত জ্বল জ্বল করছে তার মুখ, এক মুহূর্তে স্পষ্ট হচ্ছে আবার একটু পর ঘোলাটে। আগের মতোই আছে সে, শুধু শাখা আর সিদুরে বালিকা থেকে নারীতে রূপান্তরের একটা ছাপ তার অবয়বে। তবে আশা করেছিলো শাড়িতে আসবে সে। মাঝখানে বন্ধুর বোনের বিয়ের জন্য বেনারস পল্লী গিয়েছিলো সে। একটা বাসন্তী রঙের শাড়ি তার খুব পছন্দ হয়েছিলো। তরীকে মানাতো খুব। 

মন্দিরের ধূপের গন্ধে তার চোখ বুঝে এল। হঠাৎ মনে হলো চারপাশের সব আলো নিভে গেছে। শুধু ভেসে আসছে পুরোহিতের সন্ধ্যাকালীন আরতি, "দে মা তারা পাগল করে"- সে কি পাগল হয়েছে? নাকি এই শহরই তাকে পাগল করে দিয়েছে? চোখ খুলতেই দেখে সবকিছু আগের মতোই আছে। শুধু সে একা। 

 ঘড়িতে এখন সাতটা বেজে সাইত্রিশ, সময় চলেই যায় যেভাবেই যাক না কেনো। যাবার পালা এখন। সময় কারো জন্য অপেক্ষা করে না, তারও করা ঠিক না। সে তাই বেরিয়ে এলো—অথবা বলা ভালো, নিজেকে বের করে নিয়ে আসল। 

মন্দিরের ধূপের গন্ধ এখনও নাকে লেগে আছে, কিন্তু বাইরের বাতাসে যেন একটা ভারী নি:শ্বাস। হুট করে এইখানের ব্যস্ততা বেড়ে গেলো মনে হলো। ব্যস্ততার ভিড়ে ডুব দিলো সে নিজেও। সদ্য শিখা শব্দ একটা ব্যস্ততার ভিড় ঠেলে  মাথায় আসল “Eremitism”- যার মানে ধীরে ধীরে পরিচিত জায়গা থেকে দূরে সরে যাওয়া, not out of malice but a desire for solitude or renewal। 


Comments

Popular posts from this blog

আপনের দিনগুলি-০৩

  (তৃতীয় পর্ব) রাত অনেক, প্রচণ্ড শীত বাইরে। কনকনে শীতল হাওয়া বইছে। ঘুম আসছে না আপনের চোখে। বাসার নীচে, কাছাকাছি কোথাও হতে ট্রাক থেকে ইট নামানোর শব্দ কানে ভেসে আসে। এই শহর কখনো নীরব হয়না, রাতেও না। এই শহরের দেওয়ালগুলো কখনও নীরব শান্তির স্বাদ আস্বাদন করতে পারেনা। বিরামহীন শব্দের ভারে শ্রান্ত তাদের দাঁড়িয়ে থাকা। মাঝখানে ক’দিনের জন্য গ্রামের বাড়ি গিয়েছিলো সে। সেখানেও শীত ছিলো তবে শহরের মতো কোলাহল ছিলো না। আর কোলাহল এর অভাবে সেখানে শীতের মাত্রা আরও ভারী, নিঃশব্দের মাত্রা আরও প্রকট। টিনের চালে গাছের পাতা থেকে ঝরে পড়া শিশিরের শব্দ কানে আসত। কখনও দূর থেকে শিয়ালের ডাক, আর সেই ডাকে হঠাত জেগে উঠা গৃহে পালিত হাঁসের ভয় পাওয়া আর্তনাদ। ঘুম জড়িয়ে আসত চোখে।  আজ আপনের চোখে ঘুম নেই। তরীর কথা মনে পড়ছে না তো? তরীর কথা মনে না পড়লেও, স্মৃতিগুলা মনে হয় এই শীতের রাতেও লেপের উষ্ণতা নিয়ে ভর করতে চায় তার উপর। বিছানা ছেড়ে সিগারেট নিয়ে বারান্দায় গিয়ে গ্রীলের বাইরে চোখ রাখল আপন।  এভাবেই দিনের সাথে সাথে রাত কেটে যাচ্ছে তার। কিছুটা ঘোরের মধ্যে, কিছুটা ঘোরের বাইরে। বাসা থেকে অফিস, অফিস থেকে বাসা। ম...

আপনের দিনগুলি-০৪

  শীত শেষ। দিন দশেকের কাপুনিতে শীত যেন তার সর্বস্ব দিয়ে গেছে। এখন যা আছে বা যা অনুভূত হচ্ছে, তা হলো শীতকে জিইয়ে রাখার এক অদ্ভুত তাড়না। একসময় Winter is coming বললে একটা গম্ভীর আবহ তৈরি হতো। এখন গরমকাল আসার কথাতেই মানুষের হৃদয় কেঁপে উঠে। যেমনটা আজকাল প্রায়ই কেঁপে উঠে, ঘুমের মধ্যে কিংবা জেগে থাকতেই হঠাৎ করে বিল্ডিং কেঁপে উঠে; ইদানীং ভূমিকম্প হচ্ছে খুব।  গরমকাল মানেই এখন প্রচণ্ড গরম।  উত্তপ্ত চুলার ওপর ভাত যেমন ফটফট শব্দে ফুটতে থাকে, গরমের দিনে শরীরটাও তেমনই সিদ্ধ হতে থাকে। পার্থক্য শুধু এই, এখানে শব্দ শোনা যায় না। সবকিছু ভেতরে ভেতরে ঘুমরে থাকে। ফেব্রুয়ারি মাস চলে এলো। বারো মাসের এক বছরে এই মাসটা আপনের বরাবরের পছন্দের। প্রথমত, মাসটা ছোট। দ্বিতীয়ত, এটা ভালোবাসার মাস, যুগলবন্দী হবার মাস, সরস্বতী পূজার মাস, ভাষা শহীদের মাস, বইমেলার মাস। আর তরীর সঙ্গে প্রথম দেখা হওয়ার মাসও বটে। কিন্তু এই বছরটা কেমন যেন ব্যতিক্রম। শুভ পঞ্চমীর তিথি জানুয়ারিতে পড়ে যাওয়ায় ফেব্রুয়ারি আর সরস্বতী পূজার মাস হলো না। বইমেলাও হচ্ছে না। আরও অনেক কিছুই যেন হলো না। এই মাসটা ক্রমে ‘না-হবার মাস’ হয়ে উঠছে...

A Ruined Rose

  My days were fading away Like a rose forgotten, Between the warm pages of a book. Or  a rose lying silently  Upon the desk of a desolate soul, Slowly surrendering  To the quiet heat of the morning sun. Slowly it withered,  Losing fragrance, color and grace Until nothing remained  But the faint memory of a rose. Sometimes a life, too, Disappears in such silence.