Skip to main content

আলসেমি, বৃষ্টি আর বিদায়ের কথা।

 আলসেমি এক বিশাল ব্যাপার। যাকে একবার গ্রাস করে, তার আর কিছু করতে ইচ্ছে করে না। মনে হয় বল হারিয়ে গেছে, শরীর-মন অবশ। এই রাজ্যের ভারেই নতুন কিছু লেখা থেমে থাকে। ভাবনা আসে, শব্দ জমে, অথচ অলসতার কুয়াশায় সেগুলো বাক্যে গাঁথা হয় না। খোলা জানালার ফাঁক গলে ধুলোর মতো ঢুকে পড়ে আলসেমি, আস্তে আস্তে থিতু হয়, ভারী করে তোলে আবরণ। জরাজীর্ণ জীবনের ওপরে তখন লিখতে চাওয়া মানেই নিস্ফল চেষ্টা।


তবু অনেকদিন পর মনে হলো কিছু লিখতে হবে। অনেক কিছু ঘটেছে, ঘুরা হয়েছে, কেটে গেছে সময়। যাপিত জীবনের গল্পে বড় কিছু না থাকলেও, জীবন যেহেতু জীবন—তাকে একটু অলঙ্কার দিয়ে সাজালে ক্ষতি কী?


বাইরে তখন বৃষ্টি পড়ছে। এ আগস্ট মাস একদম বৃষ্টির মাস। প্রতিদিন, প্রতিরূপে, সর্বক্ষণ। সমুদ্র সৈকতে, বাড়ির পাশে বিলের জলে, অফিসের ব্যস্ত জানালার কাঁচ বেয়ে নেমেছে বৃষ্টি। এই শহরে প্রতিদিন বৃষ্টি দরকার। এক দিনের অভাবেই গরম যেভাবে চেপে ধরে, অসহ্য লাগে নিঃশ্বাস নিতে।


কিন্তু এই বৃষ্টির মাস কেবল ভালো লাগার নয়, বিরহেরও। সময় যেন নিঃশব্দে কেটে যাচ্ছে, সাথে নিয়ে যাচ্ছে আপনজনদের। পরিচিত মুখ একে একে হারিয়ে যাচ্ছে শহর থেকে, দেশ থেকে। সেদিন বিশ্ববিদ্যালয়ের সবচেয়ে প্রিয় বন্ধু সুখনও গেল বিদেশে। বারো থেকে পঁচিশ—তেরো বছরের বন্ধুত্বে যে সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল, তা এক বিদায়বেলায় গিঁট খুলে দিলো। চোখ ভিজে আসছিল, তবু সবার সামনে চোখ দিয়ে ঝরা জল দেখানো যায় না। তাই সেই না-ফেলা অশ্রুর ভার নিয়ে বাসায় ফিরে যাওয়া। 


এভাবেই অনেকে যাচ্ছে। কারো স্বপ্নের টানে, কারো পালিয়ে যাওয়ার প্রয়োজনে। কেউ ইউরোপের নির্জন শহরে, কেউ বিশাল যুক্তরাষ্ট্রের প্রান্তে। পরিবেশই যে মানুষের জীবনের ভিত্তি, তারা জানে। পরিবেশ ভালো হলে জীবনযাত্রা সহজ হয়, আর খারাপ হলে প্রতিদিনই এক যুদ্ধ। আমাদের এই দেশের পরিবেশ ভারাক্রান্ত। মানব দূষণ থেকে শুরু করে প্রতিটি স্তরে ছড়িয়ে আছে অস্বস্তি। তার উপর রাজনৈতিক অস্থিরতা—দূষণের স্তরকে করেছে আরও ঘন। যেন ছোট্ট জলাশয়ে অনেক মাছ একসাথে হাঁসফাঁস করছে অক্সিজেনের জন্য—আমাদের অবস্থাও তেমনই।


সব মিলিয়ে স্বস্তি খুঁজে পাওয়া যায় না। মনে হয় এই সমাজে নিজেই যেন বেমানান সত্ত্বা, বা সমাজকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠা রাষ্ট্রটাই আনফিট। মুক্ত চিন্তার চর্চা নেই, সুযোগের অভাব প্রবল, আর তাতে অপচয় হচ্ছে জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান সময়গুলো।


বাইরে তখনও প্রবল বৃষ্টি। জানালার কাঁচে টুপটাপ শব্দ, অন্ধকার আকাশ জুড়ে জলছবি। আজ সারারাতই হবে বৃষ্টির রাত। বৃষ্টি, যেন না-ফেলা অশ্রুর মতোই নীরবে গোপন করছে অন্তর্গত বেদনা।

Comments

Popular posts from this blog

খামবন্দী মুহূর্ত

তোলা থাক মান-অভিমান, তোলা থাক বাক্সবন্দি কিছু স্বপ্ন, তোলা থাক রাজ্য জুড়ে তোমার নামে বয়ে যাওয়া মাতাল হাওয়া, তোলা থাক মরীচিকার বুকে ভেসে ওঠা তোমার অস্তিত্ব। তোলা থাক কলম, ফুরিয়ে যাক কালি, তোমার নামে লেখা ছোটগল্প, খামবন্দি চিঠির সারি। তোলা থাক গায়ে গা লাগানো, জ্যাম ঠেলে ছুটে চলা রিকশা, তোলা থাক অসমাপ্ত গানের লাইন, চোখে জমে থাকা নির্বাক কথামালা। তোলা থাক রাস্তার মোড়ে একটি নামের প্রতিধ্বনি— যেখানে সময় থমকে দাঁড়ায় তোমার অপেক্ষায়। তোলা থাক সবকিছু, তোলা থাক— যতদিন না জেগে ওঠে ঘুমন্ত শহর তোমার পদধ্বনিতে।

প্রতীক্ষা

  আমি দাঁড়িয়ে আছি, ঠিক সেখানেই যেখানে তুমি শেষবার দেখে গিয়েছিলে। নড়বড়ে মন তোমার— কাছে আসো, আবার ক্ষণিকেই দূরে সরে যাও। এমনটা কি ঠিক হবার ছিল? তুমি হয়তো হেঁটে যাবে সেই পথেই, হয়তো এড়িয়ে যাওয়ার গল্প আরও ভিড় জমাবে। হয়তো স্মৃতিগুলো অপুষ্টিতে ভুগবে, ঘুরে ফিরবে রাস্তায় রাস্তায়— এক মুঠো সময়ের জন্য। সে সময় হবে কি তোমার?

নাম না জানা কোন এক গল্প।

১৪ তারিখ, শুক্রবার। ছুটির দিনে কিছুটা ফাঁকা শহরে একা একা হাঁটছে আপন। শাখারি বাজারের সরু গলি দিয়ে যদিও হেঁটে যাওয়া খুব সহজ কাজ না তারপরও ছুটির দিন আর রোজার দিন হওয়াতে তার সাথে দেশের চলমান অস্থির পরিবেশে কেউ সুস্থিরভাবে বাইরে বের না হবার কারণেই হয়ত লোকজন এখানে এখনও কম।এই পরিস্থিতিতে হাঁটতে হাঁটতে একটা শাখা আর সিদুরের দোকানের সামনে দাঁড়াল আপন। ছোট্ট একটা দোকান কিন্তু সাজানো গুছানো আর সেখানে পরিপাটি সেজে বিশাল দাড়ির সমাহার নিয়ে দোকানের মালিক বসে আছে। লম্বা দাড়ির দিকে চোখ বুলাতে মনে হলো নানান রঙের বাহারে বাহারিত হইয়া আছে তার লম্বা দাড়ি। ঐতিহ্য কে ধরে আর ধারণ করে রাখার চেষ্টা, রঙের ঐতিহ্য, হোলির রং। কিন্তু প্রশ্ন হলো অনেক চাওয়ার পরেও কেউ কিছু ধরে রাখতে পারছে কি? আস্তে আস্তে হাত ফসকে কত কিছু বেরিয়ে যাচ্ছে সেই খেঁয়াল আছেই বা কজনের?  সে যাই হোক এখানে না আসলে আজকে যে হলি ছিলো তা বুঝত না সে।  এখনও যে এই শহরে একটু রং মৃদু বাতাসে উড়ে বেড়ায় তা এখানে না আসলে ইনস্টার রিল দেখে বুঝে নিতে হত। চারদিকে সারা সকাল আর দুপুরের ব্যস্ত রং ক্লান্ত হয়ে ঝিমুচ্ছে এখানে সেখানে রাস্তায় বা রাস্ত...