স্বাধীনতা মানে নিজের অধীনতা, নিজের অধীনে নিজেকে রাখা। পরাধীনতা মানে পরের অধীনে থাকা, নিজের ইচ্ছা পরের অধীনে রেখে পূরণ করা। তো স্বাধীনতা চেয়েছিলো তরী। নীল আকাশে থোকা থোকা মেঘের ভীড়ে চিলের উচ্চতায় যে রকমের স্বাধীনতা আছে ঠিক সে রকম। মাথার উপর লাল বেনারসির উড়না ঝুলছে। সিঁথি বেয়ে টিকলিটা তার ভর জানান দিচ্ছে। এই উদাম সিঁথি আজকে লেড ক্রমাইট এর রঙে ভরাট হবে। মাথা নীচু করে বসে বসে ভাবছে সে। বিয়ের দিনে মেয়েদের মাথা নীচু করে রাখতে হয়। এতে সদ্য বিবাহিতার লাজ প্রকাশ পায়। তবে তরীর মোটেও লজ্জা লাগছে না। বিয়ের কথা মনে হতেই সারাদিনের উপোস রাখা ক্লান্ত শরীরে একটা দুল খেলে গেলো। কিন্ত সেটাকে সুখ বা দুঃখের পাল্লায় মাপা থেকে নিজেকে বিরত রাখল সে।
ব্রাহ্মণ পরিবারের মেয়ে সে। বাবা মায়ের একমাত্র বড় মেয়ে। ব্রাহ্মণ পরিবারের মেয়ে বলেই হোক বা অন্য কারণেই হোক ছোটবেলা থেকেই স্বাধীনতা কেমন কমে কমে এসেছে তার জীবনে। ধুম করে বিয়ে হচ্ছে তার, বাবা মায়ের একমাত্র মেয়ের বিয়েতে বাবা মায়ের খরচের কোন বালাই নেই। আর এই একটা দিক দিয়েই মেয়েকে কিছু দিতে কার্পণ্য করেনি তার বাবা-মা। অবশেষে গলার কাটা সরে যাচ্ছে বলে কথা। পড়াশোনায় সে বরাবরই ভালো। আর এই ভালো হবার কারণেই অনেকটা নিজ প্রচেষ্টায় এবং নানান প্রতিকূলতার মাঝ দিয়ে গিয়েও সে তার মাস্টার্স সম্পন্ন করেছে।
পড়াশোনা শেষ করে চাকরীতে ঢুকে নিজের জন্য একটু স্বাধীনতা কিনতে চেয়েছিলো সে। কিন্ত মাঝে মাঝে টাকাও অনেক জায়গায় এসে নীরব দর্শক হয়ে যায়। টাকা দিয়ে স্বাধীনতা সব সময় কেনো যায় না। তার বিয়ে নিয়ে তার পরিবারের বাড়ন্ত দুশ্চিন্তা তার আর ভালো লাগছিলো না। তাই উপায়ের অভাবে বিয়ের জন্য মত দিয়ে দিলো।
পাত্র হিসেবে প্রান্তকেই তার পছন্দ হলো। ব্যাপারটা এমন না তার হাতে অপশন অনেক ছিলো। ব্রাহ্মণ মেয়েদের আর অপশনই বা কি? যেরকম সম্বন্ধ আসছিলো সেগুলার থেকে এই ছেলেকেই তার ভালো বলে মনে হল। বিয়ের জন্য মত দিয়ে দিলো। ছেলে বিদেশ থাকে আর সে সুবাদে তরী চাইলেই বিদেশ চলে যেতে পারবে এবং তার সাথে সাথে পিএইচডিটাও কমপ্লিট করে ফেলবে। তারপর ভালো লাগলে থেকে যাবে আর না লাগলে দেশে ফেরত। আপাতত চিন্তা এতটুকুই।
কানের কাছে কেউ ফিসফিস করছে। একটু বাস্তবে ফিরে এলো সে। স্বর্না, তার শৈশব থেকে শুরু করে এখন অবধি পর্যন্ত একমাত্র বান্ধবী, ফিসফিস করে জানান দিয়ে গেলো বর আসছে। অপুর সংসারের কথা মনে পড়ল তার। অপুর সংসারে সে অপর্ণা। কিন্ত অপুর সংসারে অপু আছে কি? আজকে যে মুকুট মাথায় দিয়ে আসছে তাকে বিয়ে করতে সে আসলেই তার অপু কি? মনের গহীন কোন থেকে একটা ছবি ভেসে আসার চেষ্টা করছে। নিজেকে শুধরিয়ে নিলো সে। বিয়ের দিনে অন্য মুখের চিন্তা মনে আসা বারণ। তার জামাই এর স্বরূপ মনে করার চেষ্টা করল সে।
তার জামাই দেখতে মন্দ না। পাঁচ ফুট দশ ইঞ্চি উচ্চতার, কোকড়ানো চুলের মাথার জামাই তার সাথে মানানসই যদিও এখনও একসাথে দাড়ানো হয় নাই। সমবয়সী হওয়াতে হয়ত বুঝ আর বুদ্ধি একটু ঘাটতি কিন্ত কোন মানুষই পারফেক্ট নয় আর তরীর তাতে মানিয়ে নিতে কোন আপত্তি নেই। চাকরীটা সে ছেড়ে দিয়েছে। ছেড়ে দিয়েছে নিজের ইচ্ছাতেই। বিদেশ যাবার আগে শ্বশুর আর শাশুড়ির সেবা করে যেতে চায় পাছে কেউ কিছু বলতে না পারে।
ফটোসেশন এর লোক এসেছে। ঘুমটা খুলে মাথা উচু করে ছবির জন্য পোজ দিতে হবে। ঘুমটা তুলে উপরের দিকে তাকাতেই আপনের দিকে চোখ পড়ল তার। হাতে একটা ছোট খাটো বাক্স নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। গায়ে শোকের কালো পাঞ্জাবি, সাদা পাজামা, কালো ফ্রেমের চশমা আর অগোছালো দাড়িতে একটু অস্থির লাগছে তাকে। তরীও একটু তার স্থিরতা হারালো। ফেসবুক ব্লক থাকাতে তার বিয়ের কার্ড তাকে হোয়াটস অ্যাপ করেছিলো। কিছু বলেনি সে। একটু এগিয়ে আসছে আপন, তার দিকে। তরী চাচ্ছে না এমন কিছু করুক যাতে লোকে সন্দেহ করবে। হাসি মুখেই সে আপনকে অভিবাদন জানলো…
: আপনি এসেছেন তাইলে।
: বিয়ের দাওয়াত দিছেন তো না আসি কেমনে।
: খুব খুশী হলাম।
: আপনাকে দেখে বুঝা যাচ্ছে। যাই হোক ঘাবড়ানোর কিছু কারণ নেই। এসেছি, দেখা হলো, চলে যাবো। নিন এইটা রাখেন।
এই ছেলেটা খালি দিতেই শিখেছে। কয়েকবারের দেখায় কোনদিন খালি হাতে আসেনি শুধুমাত্র প্রথম দিন বাদে।
বলেই তরীর হাতে বাক্স ধরিয়ে আপন পিছু হাটতে লাগলো। যতই আপন দূরে সরে যাচ্ছে ততই তরীর দৃষ্টি ঘন হচ্ছে, সেখানে হারিয়ে যাচ্ছে আপন, আর তার অপুর সংসার। সকল চাওয়া পূরণ হলে জীবনের আর কোন মানে থাকতো না। তরীর জীবনে আপনের অনুপস্থিতি তাকে তার জীবনের মানে দিয়ে গেলো। তার ইচ্ছা হলো চিৎকার করে আপনকে ডাক দেবার, তাকে ফিরিয়ে নিয়ে আসার। ইচ্ছা করে তার হাত ধরে দূরে, অনেক দূরে চলে যাবার, যেখানে নীরবে তারা একসাথে তাদের সংসার গড়ে তুলবে। জানে তরী তাদের সংসার সুখের হবে, স্বাধীন হবে।
গলা ধরে এলো তরীর। সে কাঁদছে না, কিন্তু চোখের কোন বেয়ে নেমে আসা জল জানিয়ে দিলো—নিজের অধীনে থাকা স্বাধীনতা সে বিসর্জন দিচ্ছে। স্বর্ণা এসে দাঁড়ালো পাশে। টিস্যু দিয়ে চোখ মুছে দিলো।
তরী আবার তৈরি হলো—হাসিমুখে ক্যামেরার সামনে দাঁড়াবার জন্য।
Comments
Post a Comment