Skip to main content

কলরবের গল্প

চাপা পড়ে থাকা নিঃশব্দের মাঝেও এক ধরনের শব্দ থাকে। যেটা কানে নয়, মনে লাগে। মাঝে মাঝে সেই শব্দ শোনার ইচ্ছে জাগে প্রবলভাবে। শহরের ভেতর দাঁড়িয়ে যখন চারপাশে কেবল হর্ন, চেঁচামেচি আর মানুষে-মানুষে মিশে যাওয়া কথার গোলমাল কানে আসে, তখনই মনে হয় কলরবে কলরবে আছে অনেক পার্থক্য।


লোকালয়ের কলরব একরকম। সেখানে শব্দ মানেই ব্যস্ততা, তাড়াহুড়া, প্রতিযোগিতা। সবাই কিছু না কিছু পেতে ছুটছে, অথচ সেই পাওয়াটা আসলে কী তা কেউ স্পষ্ট করে জানে না। মানুষের এই মিশ্রিত শব্দের ভেতরে শান্তি নেই; আছে কেবল একরকম কোলাহল, যা ধীরে ধীরে ক্লান্ত করে ফেলে বাঁচার জন্য প্রয়োজনীয় প্রতিটা ইন্দ্রিয়কে।


অন্যদিকে আছে আরেক রকম কলরব, যেটা নিরালায় শোনা যায়। পাখিদের মিছিলে ভেসে আসা ডাক, বাতাসে পাতার দোল, গাছের আড়ালে থেকে ভেসে আসা লুকিয়ে থাকা চড়ুই এর শীষ। এই কলরব গোলমাল নয়, বরং একধরনের ছন্দ। তীব্র গরমের দিনে হাপিয়ে পড়া মন যেন সেই সুরেই সামান্য স্বস্তি খুঁজে পায়।


দুই কলরবের এই পার্থক্য আসলে আমাদের জীবনবোধের প্রতিচ্ছবি। আমরা প্রতিদিন এমন এক ব্যস্ততার মধ্যে বাঁচি, যেখানে শব্দই আমাদের সঙ্গী, কিন্তু সেই শব্দের ভেতরে কোনো সুর থাকে না। অথচ প্রকৃতি তার নিজের মতো করে প্রতিদিন একেকটা সুর তোলে, যা আমরা খুব কমই শুনতে পাই, কারণ আমাদের কান তখন শহুরে গোলমালে আটকে থাকে।


মানুষ যদি একটু থামতে পারতো, যদি এক মুহূর্তের জন্যও নিঃশব্দতার ভেতর কান পাততো! তাহলে হয়তো বুঝতে পারতো, প্রকৃত কলরব মানে শুধু শব্দ নয়; মানে জীবনের চলন, শান্তির স্রোত, আর নিঃশব্দতার ভেতর লুকিয়ে থাকা এক স্নিগ্ধ প্রশান্তি।


এই আর কি।

Comments

Popular posts from this blog

খামবন্দী মুহূর্ত

তোলা থাক মান-অভিমান, তোলা থাক বাক্সবন্দি কিছু স্বপ্ন, তোলা থাক রাজ্য জুড়ে তোমার নামে বয়ে যাওয়া মাতাল হাওয়া, তোলা থাক মরীচিকার বুকে ভেসে ওঠা তোমার অস্তিত্ব। তোলা থাক কলম, ফুরিয়ে যাক কালি, তোমার নামে লেখা ছোটগল্প, খামবন্দি চিঠির সারি। তোলা থাক গায়ে গা লাগানো, জ্যাম ঠেলে ছুটে চলা রিকশা, তোলা থাক অসমাপ্ত গানের লাইন, চোখে জমে থাকা নির্বাক কথামালা। তোলা থাক রাস্তার মোড়ে একটি নামের প্রতিধ্বনি— যেখানে সময় থমকে দাঁড়ায় তোমার অপেক্ষায়। তোলা থাক সবকিছু, তোলা থাক— যতদিন না জেগে ওঠে ঘুমন্ত শহর তোমার পদধ্বনিতে।

আপনের দিনগুলি

  (তৃতীয় পর্ব) রাত অনেক, প্রচণ্ড শীত বাইরে। কনকনে শীতল হাওয়া বইছে। ঘুম আসছে না আপনের চোখে। বাসার নীচে, কাছাকাছি কোথাও হতে ট্রাক থেকে ইট নামানোর শব্দ কানে ভেসে আসে। এই শহর কখনো নীরব হয়না, রাতেও না। এই শহরের দেওয়ালগুলো কখনও নীরব শান্তির স্বাদ আস্বাদন করতে পারেনা। বিরামহীন শব্দের ভারে শ্রান্ত তাদের দাঁড়িয়ে থাকা। মাঝখানে ক’দিনের জন্য গ্রামের বাড়ি গিয়েছিলো সে। সেখানেও শীত ছিলো তবে শহরের মতো কোলাহল ছিলো না। আর কোলাহল এর অভাবে সেখানে শীতের মাত্রা আরও ভারী, নিঃশব্দের মাত্রা আরও প্রকট। টিনের চালে গাছের পাতা থেকে ঝরে পড়া শিশিরের শব্দ কানে আসত। কখনও দূর থেকে শিয়ালের ডাক, আর সেই ডাকে হঠাত জেগে উঠা গৃহে পালিত হাঁসের ভয় পাওয়া আর্তনাদ। ঘুম জড়িয়ে আসত চোখে।  আজ আপনের চোখে ঘুম নেই। তরীর কথা মনে পড়ছে না তো? তরীর কথা মনে না পড়লেও, স্মৃতিগুলা মনে হয় এই শীতের রাতেও লেপের উষ্ণতা নিয়ে ভর করতে চায় তার উপর। বিছানা ছেড়ে সিগারেট নিয়ে বারান্দায় গিয়ে গ্রীলের বাইরে চোখ রাখল আপন।  এভাবেই দিনের সাথে সাথে রাত কেটে যাচ্ছে তার। কিছুটা ঘোরের মধ্যে, কিছুটা ঘোরের বাইরে। বাসা থেকে অফিস, অফিস থেকে বাসা। ম...

প্রতীক্ষা

  আমি দাঁড়িয়ে আছি, ঠিক সেখানেই যেখানে তুমি শেষবার দেখে গিয়েছিলে। নড়বড়ে মন তোমার— কাছে আসো, আবার ক্ষণিকেই দূরে সরে যাও। এমনটা কি ঠিক হবার ছিল? তুমি হয়তো হেঁটে যাবে সেই পথেই, হয়তো এড়িয়ে যাওয়ার গল্প আরও ভিড় জমাবে। হয়তো স্মৃতিগুলো অপুষ্টিতে ভুগবে, ঘুরে ফিরবে রাস্তায় রাস্তায়— এক মুঠো সময়ের জন্য। সে সময় হবে কি তোমার?