Skip to main content

ভ্রমণ বৃত্তান্ত

 পাহাড়, নীরবতা আর হারিয়ে যাওয়া শব্দের গল্প

দুই পাশে বেতের ঘর আর মাঝখানে সরু হয়ে পাহাড়ের গা বেয়ে ওঠানামা করা আঁকাবাঁকা পথ। এই দৃশ্য দেখতে দেখতে ঘুমু ঘুমু চোখে সাজেকের পথে যাত্রা। চলতি পথের মাঝখানে ঘর থেকে বেরিয়ে ছোট ছোট ছেলে-পুলে মিলে হাত নেড়ে স্বাগতম জানাচ্ছে তাদের। এটাই চিরায়ত সাজেকের দিকে যাত্রাকালের চিত্র। সেই আদিমতা এখন অনেকটাই বিলুপ্ত। পাহাড়ের বুক সমতল করে গৃহপালিত জীবনের স্থায়ী বসতি গড়ে উঠেছে। তবুও জীবনকে সহজ করার প্রক্রিয়াটা এখানে আজও সহজ নয়। পাহাড়ের উপর জীবন এমনিতেই কঠিন। তার ওপর সশস্ত্র বাহিনীর দাপটে জায়গায় জায়গায় আটকে থাকে স্বাভাবিক জীবনপ্রবাহ। দুই-একটি পাকা দালানের নিচে দেখা যায় সেই জীর্ণশীর্ণ বেতের ঘর। ভেতরে চোখ রাখলে বোঝা যায় অভাবে না স্বভাব বসত কারণেই এইরকম শির্ণতা। যেটাই হোক, সরঞ্জাম বলতে হাতে গোনা কয়েকটি জিনিস আর বিশাল প্রকৃতির সান্নিধ্যে এই স্বল্পতা বোধহয় এখানকার মানুষদের কাছে কিছুই নয়।

তবুও চোখে পড়ে ঐতিহ্যের রেশ। গামছা আর ব্লাউজ কিংবা টপ পরিহিত পাহাড়ি নারীদের শরীরজুড়ে ঐতিহ্যের স্মৃতি এখনও বেঁচে আছে।


ভিড়ের মাঝেও শান্তির খোঁজ


ছুটির দিনে শহর ছাড়া মানে শহরের ব্যস্ত কোলাহল থেকে যতটা সম্ভব দূরে যাওয়ার চেষ্টা। কিন্তু ছুটি তো সবারই। তাই পাহাড় হোক বা সাগর, মানুষের আগ্রহের যেকোনো জায়গাতেই বিশালতার ভেতর ছোট হয়ে ভিড় জমায়। আর ভিড়ের সাথে আসে শব্দ, আসে দূষণ। এই ছোট দেশে প্রকৃত শান্তি খুঁজে পাওয়া তাই সহজ নয়।

তবুও দিনশেষের ধকল কাটিয়ে ব্যাম্বু চিকেন খাওয়া, হাতে কফি নিয়ে রাতের অপেক্ষমাণ কম ভিড়ে লাইভ কনসার্টের তালে তালে মনের সুপ্ত ছন্দ গুপ্ত না থেকে বের হয়ে আসে।  কিংবা সাজেকের পাহাড়ঘেঁষা অব্যবস্থাপনার মাঝেও কাঠের ফ্রেমে গড়ে ওঠা ছোট্ট রিসোর্টঘরের বারান্দায় বসে পাহাড়ের বুকে মেঘের ভেলা ছুঁয়ে বেরিয়ে আসা চাঁদের বাঁকা হাসি, শীতের মৃদু বাতাসে অশান্ত মন ধীরে ধীরে স্থির হতে শেখে। ঠিক তখনই একটু প্রকৃত শান্তির দেখা মেলে।


যে শব্দটা আর শোনা যায় না

তিন বছর আগে শেষবার যখন সাজেক আসা হয়েছিলো, তখন রাত নামলেই পাহাড় একেবারে অন্য রকম হয়ে উঠত। গভীর নিস্তব্ধতার বুক চিরে হঠাৎ হঠাৎ ভেসে আসত তক্ষকের রাতজাগা ডাক। একটা আদিম পরিবেশ, যেখানে পাহাড় যেন নিজেই কথা বলছে। সেই ডাক শুনে ঘুম ভাঙত, আবার সেই ডাকের মধ্যেই ঘুমিয়ে পড়া যেত।

এবার রাত তেমন নয়। নীরবতা আছে, কিন্তু তার ভেতরে আর সেই ডাক নেই। শব্দহীনতার এই শূন্যতাই সবচেয়ে বেশি কানে বাজে। মনে হয়, পাহাড় এখনও দাঁড়িয়ে আছে, কিন্তু তার বুকের ভেতরের কিছু একটা হারিয়ে গেছে চুপিচুপি, নিঃশব্দে।

ভোর, মেঘ আর হালকা হয়ে যাওয়া মন

ভোরবেলা ঘুম ভাঙে আলোয় নয়, মেঘে মানে যখন ঘুম ভাঙ্গে ঠিক তখনও পূর্ব কোনে সুর্যের উদয় হয়নি। বেশ ভালো একটা বাতস বইছে, শীত করছে আবার করছেও না এইরকম পরিস্থিতি। বারান্দায় এসে দাঁড়ালে মনে হয়, আমি পাহাড়ের উপর দাঁড়িয়ে নেই, মেঘের উপর দাঁড়িয়ে আছি। একটা স্বপ্নিল আবাহ চারপাশে। 


এই ভোরে কোনো তাড়াহুড়ো নেই, কোনো শব্দ নেই। ঠান্ডা হাওয়ার সাথে নিঃশ্বাস মিশিয়ে চুপচাপ বসে থাকা আর বিভোর হওয়া ছাড়া অন্য কোন চিন্তা আসে না মাথার মধ্যে। শহরে যেসব চিন্তা রাত জেগে থাকে, এখানে তারা মেঘের মতোই একটু পর পর মিলিয়ে যায়। মাথা হালকা থাকে। আর এইরকম ছোট ছোট মুহূর্ত একসাথে জমে একটা জীবনের সামগ্রিক সৌন্দর্য তৈরি করে। এই ভোরের মেঘও তেমনই এক মুহূর্ত যা মনকে একটু সমৃদ্ধ করে, শান্ত রাখে।


পাহাড়, গাছ আর টিকে থাকা ছায়া

এখানে একটি শিবমন্দির আছে। তার পাশেই দাঁড়িয়ে আছে একটি বিশাল বটগাছ। গাছটির আকার আর বিস্তৃতি দেখে মনে হয় এর বয়স মন্দিরের থেকেও বেশি। সাজেকে এখনো এমন শতবর্ষী গাছ আছে—যারা মাথার ওপর ছায়া দিয়ে জায়গা দখল করে দাঁড়িয়ে আছে।

অথচ পাহাড়জুড়ে চলছে বুনো গাছ নিধন। বনায়নের নামে রোপণ করা হচ্ছে শিরীষ, কলা, পেঁপের মতো গৃহপালিত গাছ। ভরা মাথার চুল খালি হয়ে গেলে যেমন বিবর্ণ লাগে, পাহাড়ের কোথাও কোথাও তেমনই রূপ নিয়েছে। তারপরও বীর দর্পে যারা দাঁড়িয়ে আছে তারাই পুরানো দিনের স্মৃতির ধারক আর বাহক হয়ে আমাদের স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে আদিম পাহাড়ের আদিম বুনো ভাব।

শেষে শুধু এটুকুই

মানুষ নিজেই দূষণ সৃষ্টি করে, আবার সেই দূষণের কারণেই সবকিছু মনের মতো হয় না। তবুও সীমাবদ্ধতার মাঝেই গড়ে ওঠা এই ছোটখাটো ভ্রমণগুলো চলমান জীবনের জটিলতা থেকে আমাদের একটু দূরে নিয়ে যায়। পাহাড়ের বিশালতার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকে খুব ছোট মনে হয়, আর ঠিক তখনই মানুষ মেঘের মতো হালকা হয়ে ফেরে।


Comments

Popular posts from this blog

খামবন্দী মুহূর্ত

তোলা থাক মান-অভিমান, তোলা থাক বাক্সবন্দি কিছু স্বপ্ন, তোলা থাক রাজ্য জুড়ে তোমার নামে বয়ে যাওয়া মাতাল হাওয়া, তোলা থাক মরীচিকার বুকে ভেসে ওঠা তোমার অস্তিত্ব। তোলা থাক কলম, ফুরিয়ে যাক কালি, তোমার নামে লেখা ছোটগল্প, খামবন্দী চিঠির সারি। তোলা থাক গায়ে গা লাগানো, জ্যাম ঠেলে ছুটে চলা রিকশা, তোলা থাক অসমাপ্ত গানের লাইন, চোখে জমে থাকা নির্বাক কথামালা। তোলা থাক রাস্তার মোড়ে একটি নামের প্রতিধ্বনি— যেখানে সময় থমকে দাঁড়ায় তোমার অপেক্ষায়। তোলা থাক সবকিছু, তোলা থাক— যতদিন না জেগে ওঠে ঘুমন্ত শহর তোমার পদধ্বনিতে।

আপনের দিনগুলি

  (তৃতীয় পর্ব) রাত অনেক, প্রচণ্ড শীত বাইরে। কনকনে শীতল হাওয়া বইছে। ঘুম আসছে না আপনের চোখে। বাসার নীচে, কাছাকাছি কোথাও হতে ট্রাক থেকে ইট নামানোর শব্দ কানে ভেসে আসে। এই শহর কখনো নীরব হয়না, রাতেও না। এই শহরের দেওয়ালগুলো কখনও নীরব শান্তির স্বাদ আস্বাদন করতে পারেনা। বিরামহীন শব্দের ভারে শ্রান্ত তাদের দাঁড়িয়ে থাকা। মাঝখানে ক’দিনের জন্য গ্রামের বাড়ি গিয়েছিলো সে। সেখানেও শীত ছিলো তবে শহরের মতো কোলাহল ছিলো না। আর কোলাহল এর অভাবে সেখানে শীতের মাত্রা আরও ভারী, নিঃশব্দের মাত্রা আরও প্রকট। টিনের চালে গাছের পাতা থেকে ঝরে পড়া শিশিরের শব্দ কানে আসত। কখনও দূর থেকে শিয়ালের ডাক, আর সেই ডাকে হঠাত জেগে উঠা গৃহে পালিত হাঁসের ভয় পাওয়া আর্তনাদ। ঘুম জড়িয়ে আসত চোখে।  আজ আপনের চোখে ঘুম নেই। তরীর কথা মনে পড়ছে না তো? তরীর কথা মনে না পড়লেও, স্মৃতিগুলা মনে হয় এই শীতের রাতেও লেপের উষ্ণতা নিয়ে ভর করতে চায় তার উপর। বিছানা ছেড়ে সিগারেট নিয়ে বারান্দায় গিয়ে গ্রীলের বাইরে চোখ রাখল আপন।  এভাবেই দিনের সাথে সাথে রাত কেটে যাচ্ছে তার। কিছুটা ঘোরের মধ্যে, কিছুটা ঘোরের বাইরে। বাসা থেকে অফিস, অফিস থেকে বাসা। ম...

আপনের দিনগুলি

  শীত শেষ। দিন দশেকের কাপুনিতে শীত যেন তার সর্বস্ব দিয়ে গেছে। এখন যা আছে বা যা অনুভূত হচ্ছে, তা হলো শীতকে জিইয়ে রাখার এক অদ্ভুত তাড়না। একসময় Winter is coming বললে একটা গম্ভীর আবহ তৈরি হতো। এখন গরমকাল আসার কথাতেই মানুষের হৃদয় কেঁপে উঠে। যেমনটা আজকাল প্রায়ই কেঁপে উঠে, ঘুমের মধ্যে কিংবা জেগে থাকতেই হঠাৎ করে বিল্ডিং কেঁপে উঠে; ইদানীং ভূমিকম্প হচ্ছে খুব।  গরমকাল মানেই এখন প্রচণ্ড গরম।  উত্তপ্ত চুলার ওপর ভাত যেমন ফটফট শব্দে ফুটতে থাকে, গরমের দিনে শরীরটাও তেমনই সিদ্ধ হতে থাকে। পার্থক্য শুধু এই, এখানে শব্দ শোনা যায় না। সবকিছু ভেতরে ভেতরে ঘুমরে থাকে। ফেব্রুয়ারি মাস চলে এলো। বারো মাসের এক বছরে এই মাসটা আপনের বরাবরের পছন্দের। প্রথমত, মাসটা ছোট। দ্বিতীয়ত, এটা ভালোবাসার মাস, যুগলবন্দী হবার মাস, সরস্বতী পূজার মাস, ভাষা শহীদের মাস, বইমেলার মাস। আর তরীর সঙ্গে প্রথম দেখা হওয়ার মাসও বটে। কিন্তু এই বছরটা কেমন যেন ব্যতিক্রম। শুভ পঞ্চমীর তিথি জানুয়ারিতে পড়ে যাওয়ায় ফেব্রুয়ারি আর সরস্বতী পূজার মাস হলো না। বইমেলাও হচ্ছে না। আরও অনেক কিছুই যেন হলো না। এই মাসটা ক্রমে ‘না-হবার মাস’ হয়ে উঠছে...