Skip to main content

আপনের দিনগুলি

 শীত শেষ।

দিন দশেকের কাপুনিতে শীত যেন তার সর্বস্ব দিয়ে গেছে। এখন যা আছে বা যা অনুভূত হচ্ছে, তা হলো শীতকে জিইয়ে রাখার এক অদ্ভুত তাড়না। একসময় Winter is coming বললে একটা গম্ভীর আবহ তৈরি হতো। এখন গরমকাল আসার কথাতেই মানুষের হৃদয় কেঁপে উঠে। যেমনটা আজকাল প্রায়ই কেঁপে উঠে, ঘুমের মধ্যে কিংবা জেগে থাকতেই হঠাৎ করে বিল্ডিং কেঁপে উঠে; ইদানীং ভূমিকম্প হচ্ছে খুব। গরমকাল মানেই এখন প্রচণ্ড গরম। উত্তপ্ত চুলার ওপর ভাত যেমন ফটফট শব্দে ফুটতে থাকে, গরমের দিনে শরীরটাও তেমনই সিদ্ধ হতে থাকে। পার্থক্য শুধু এই, এখানে শব্দ শোনা যায় না। সবকিছু ভেতরে ভেতরে ঘুমরে থাকে।

ফেব্রুয়ারি মাস চলে এলো। বারো মাসের এক বছরে এই মাসটা আপনের বরাবরের পছন্দের। প্রথমত, মাসটা ছোট। দ্বিতীয়ত, এটা ভালোবাসার মাস, যুগলবন্দী হবার মাস, সরস্বতী পূজার মাস, ভাষা শহীদের মাস, বইমেলার মাস। আর তরীর সঙ্গে প্রথম দেখা হওয়ার মাসও বটে। কিন্তু এই বছরটা কেমন যেন ব্যতিক্রম। শুভ পঞ্চমীর তিথি জানুয়ারিতে পড়ে যাওয়ায় ফেব্রুয়ারি আর সরস্বতী পূজার মাস হলো না। বইমেলাও হচ্ছে না। আরও অনেক কিছুই যেন হলো না। এই মাসটা ক্রমে ‘না-হবার মাস’ হয়ে উঠছে। ভাবনায় পড়ে যাওয়ার মতোই অবস্থা।


মাঘ আর ফাল্গুন মিলিয়ে যে সময়টা নিয়ে ফেব্রুয়ারি আসে, সেই সময়ে বিয়ে বেশি হয়। এই সময়টাতে তাই প্রতিবছরই বিয়ে খাওয়ার হিড়িক থাকে। কখনো আত্মীয়ের বিয়ে, কখনো বন্ধু বা ভাইয়ের। এইবারও তার ব্যতিক্রম নেই। এই বছরের বিয়ে খাওয়ার পর্ব শেষ হলো তারই খুব কাছের এক বন্ধুর। তাদের একটা ব্যাচেলর গ্রুপ ছিলো। বিয়ে হতে হতে দশ জনের এই গ্রুপের আর বাকি রইল সে। 

অন্যের বিয়েতে যাওয়া আর খাওয়া-দাওয়া করতে তার আপত্তি নেই বরং মজাই লাগে। কিন্ত এই বিয়ে খেয়ে ফেলার পর একটা সমস্যা মাথা চাড়া দিয়ে উঠেছে, মাথার মধ্যে চোখ দুটি দিয়ে সবার দৃষ্টি এখন তার দিকে। এইতো সেদিন বিয়ের দিনে খাওয়ার টেবিলে পাশে এসে এক প্রতিবেশী দাঁড়িয়ে উৎসুক ভঙ্গিতে বলে ফেলল- 

"তোরটা কবে খাচ্ছি?"  হাসল সে। জল খেলো কিন্তু এর কোন সদুত্তর নাই তার কাছে, ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকা ছাড়া।

বিয়ের ব্যাপারে সে এখনও উদাসীন। এই উদাসীনতার পেছনে কারণ আছে। সারাজীবন ব্যাচেলর থাকার ইচ্ছা তার নেই, আবার তাড়াহুড়ো করে বিয়ে করে ফেলার ভাবনাও তার কখনো ছিল না।

এই তাড়াহুড়োর বিয়েটাকেই সবাই বলে অ্যারেঞ্জড ম্যারেজ। অচেনা, অজানা একজনের সঙ্গে হুট করে ঘর বাঁধার মধ্যে তার আপত্তি নেই। তবু মনে হয়, কিছু জিনিস আগে থেকে জানা থাকলে ঝামেলা কমে। কিন্তু সমস্যা হলো, তার জীবনে কখনো এমন ভালোবাসা আসেনি যা বিয়ে পর্যন্ত গড়াবে। আর যেটাকে বিয়ে পর্যন্ত নিয়ে যাওয়ার কথা ভেবেছিল, সেটাই একসময় মরীচিকা হয়ে গেছে। মাঝেমধ্যে নিজেকে তার কমিটমেন্ট ফোবিক মনে হয়। দায়িত্ব নিতে ভয় লাগে। মাঝে মাঝে তার মনে হয় বিয়ে নয়, দায়িত্ব এড়াতে চায় সে। তাই সে দূর থেকেই সবার উপস্থিতি জ্বলজ্বল করতে দেখে। কাছে গেলে আর কিছুই পাওয়া যায় না।

বিয়ের করার কোনো প্রবল ইচ্ছাও তার মধ্যে জন্মায়নি। আশেপাশের বন্ধু বা সহকর্মীদের দিকে তাকালে তার মনে হয়, সম্পর্ক গড়া খুব সহজ কাজ নয়। আর সমাজের দায়ে দায়ী হয়ে তাড়াহুড়ো করে বিয়ে করে ফেলার মধ্যে এমন দায় থাকে, যা পরে সামলানো কঠিন হয়ে পড়ে। যেমন চোখের সামনে তার ব্যাচেলর বন্ধুগুলা বিবাহিত হয়ে কেমন জানি দূরে চলে গেছে। আগের মতো আলাপ নাই, আড্ডা নাই।

নতুন সম্পর্ক গড়ার সাথে সাথে যদি পুরানো বন্ধুত্বের সম্পর্ক ভেঙ্গে যাবার কারণ থাকে তাইলে ধরে নিতে হবে সঠিকভাবে সম্পর্কের বুনন হচ্ছে না। আর চোখের সামনে এগুলা দেখতে দেখতে মনে হচ্ছে চোখের জ্যোতিও কমে যাচ্ছে তার। তাই আজকাল ঝাপসা লাগে অনেক কিছু।  


বয়সও হচ্ছে, এটাও সত্য।

তো যে অংক মিলবে না, তা জোর করে মিলানোর দরকার নেই।


বসন্ত এসেছে। আমের মুকুলের গন্ধে বাতাস ভরে আছে।কোকিল ডেকে উঠবে একটু পরেই। গ্রামের সরু পথ ধরে হাঁটছে আপন। সে জানে না, সে পিছিয়ে পড়ছে, নাকি নিজের গতিতে হাঁটছে।

শুধু মনে হয় সময়ের স্রোত বয়ে যাচ্ছে আর সে এখনও তীরে বসে। নাকি তীরটাই ধীরে ধীরে সরে যাচ্ছে, তাকে অকূল পাথারে ভাসিয়ে দিয়ে, সেটাও সে নিশ্চিত না।



(চতুর্থ পর্ব)


(চতুর্থ পর্ব)


Comments

Popular posts from this blog

খামবন্দী মুহূর্ত

তোলা থাক মান-অভিমান, তোলা থাক বাক্সবন্দি কিছু স্বপ্ন, তোলা থাক রাজ্য জুড়ে তোমার নামে বয়ে যাওয়া মাতাল হাওয়া, তোলা থাক মরীচিকার বুকে ভেসে ওঠা তোমার অস্তিত্ব। তোলা থাক কলম, ফুরিয়ে যাক কালি, তোমার নামে লেখা ছোটগল্প, খামবন্দি চিঠির সারি। তোলা থাক গায়ে গা লাগানো, জ্যাম ঠেলে ছুটে চলা রিকশা, তোলা থাক অসমাপ্ত গানের লাইন, চোখে জমে থাকা নির্বাক কথামালা। তোলা থাক রাস্তার মোড়ে একটি নামের প্রতিধ্বনি— যেখানে সময় থমকে দাঁড়ায় তোমার অপেক্ষায়। তোলা থাক সবকিছু, তোলা থাক— যতদিন না জেগে ওঠে ঘুমন্ত শহর তোমার পদধ্বনিতে।

আপনের দিনগুলি

  (তৃতীয় পর্ব) রাত অনেক, প্রচণ্ড শীত বাইরে। কনকনে শীতল হাওয়া বইছে। ঘুম আসছে না আপনের চোখে। বাসার নীচে, কাছাকাছি কোথাও হতে ট্রাক থেকে ইট নামানোর শব্দ কানে ভেসে আসে। এই শহর কখনো নীরব হয়না, রাতেও না। এই শহরের দেওয়ালগুলো কখনও নীরব শান্তির স্বাদ আস্বাদন করতে পারেনা। বিরামহীন শব্দের ভারে শ্রান্ত তাদের দাঁড়িয়ে থাকা। মাঝখানে ক’দিনের জন্য গ্রামের বাড়ি গিয়েছিলো সে। সেখানেও শীত ছিলো তবে শহরের মতো কোলাহল ছিলো না। আর কোলাহল এর অভাবে সেখানে শীতের মাত্রা আরও ভারী, নিঃশব্দের মাত্রা আরও প্রকট। টিনের চালে গাছের পাতা থেকে ঝরে পড়া শিশিরের শব্দ কানে আসত। কখনও দূর থেকে শিয়ালের ডাক, আর সেই ডাকে হঠাত জেগে উঠা গৃহে পালিত হাঁসের ভয় পাওয়া আর্তনাদ। ঘুম জড়িয়ে আসত চোখে।  আজ আপনের চোখে ঘুম নেই। তরীর কথা মনে পড়ছে না তো? তরীর কথা মনে না পড়লেও, স্মৃতিগুলা মনে হয় এই শীতের রাতেও লেপের উষ্ণতা নিয়ে ভর করতে চায় তার উপর। বিছানা ছেড়ে সিগারেট নিয়ে বারান্দায় গিয়ে গ্রীলের বাইরে চোখ রাখল আপন।  এভাবেই দিনের সাথে সাথে রাত কেটে যাচ্ছে তার। কিছুটা ঘোরের মধ্যে, কিছুটা ঘোরের বাইরে। বাসা থেকে অফিস, অফিস থেকে বাসা। ম...

প্রতীক্ষা

  আমি দাঁড়িয়ে আছি, ঠিক সেখানেই যেখানে তুমি শেষবার দেখে গিয়েছিলে। নড়বড়ে মন তোমার— কাছে আসো, আবার ক্ষণিকেই দূরে সরে যাও। এমনটা কি ঠিক হবার ছিল? তুমি হয়তো হেঁটে যাবে সেই পথেই, হয়তো এড়িয়ে যাওয়ার গল্প আরও ভিড় জমাবে। হয়তো স্মৃতিগুলো অপুষ্টিতে ভুগবে, ঘুরে ফিরবে রাস্তায় রাস্তায়— এক মুঠো সময়ের জন্য। সে সময় হবে কি তোমার?