Skip to main content

Posts

আপনের দিনগুলি

  (তৃতীয় পর্ব) রাত অনেক, প্রচণ্ড শীত বাইরে। কনকনে শীতল হাওয়া বইছে। ঘুম আসছে না আপনের চোখে। বাসার নীচে, কাছাকাছি কোথাও হতে ট্রাক থেকে ইট নামানোর শব্দ কানে ভেসে আসে। এই শহর কখনো নীরব হয়না, রাতেও না। এই শহরের দেওয়ালগুলো কখনও নীরব শান্তির স্বাদ আস্বাদন করতে পারেনা। বিরামহীন শব্দের ভারে শ্রান্ত তাদের দাঁড়িয়ে থাকা। মাঝখানে ক’দিনের জন্য গ্রামের বাড়ি গিয়েছিলো সে। সেখানেও শীত ছিলো তবে শহরের মতো কোলাহল ছিলো না। আর কোলাহল এর অভাবে সেখানে শীতের মাত্রা আরও ভারী, নিঃশব্দের মাত্রা আরও প্রকট। টিনের চালে গাছের পাতা থেকে ঝরে পড়া শিশিরের শব্দ কানে আসত। কখনও দূর থেকে শিয়ালের ডাক, আর সেই ডাকে হঠাত জেগে উঠা গৃহে পালিত হাঁসের ভয় পাওয়া আর্তনাদ। ঘুম জড়িয়ে আসত চোখে।  আজ আপনের চোখে ঘুম নেই। তরীর কথা মনে পড়ছে না তো? তরীর কথা মনে না পড়লেও, স্মৃতিগুলা মনে হয় এই শীতের রাতেও লেপের উষ্ণতা নিয়ে ভর করতে চায় তার উপর। বিছানা ছেড়ে সিগারেট নিয়ে বারান্দায় গিয়ে গ্রীলের বাইরে চোখ রাখল আপন।  এভাবেই দিনের সাথে সাথে রাত কেটে যাচ্ছে তার। কিছুটা ঘোরের মধ্যে, কিছুটা ঘোরের বাইরে। বাসা থেকে অফিস, অফিস থেকে বাসা। ম...
Recent posts

ভ্রমণ বৃত্তান্ত

  পাহাড়, নীরবতা আর হারিয়ে যাওয়া শব্দের গল্প দুই পাশে বেতের ঘর আর মাঝখানে সরু হয়ে পাহাড়ের গা বেয়ে ওঠানামা করা আঁকাবাঁকা পথ। এই দৃশ্য দেখতে দেখতে ঘুমু ঘুমু চোখে সাজেকের পথে যাত্রা। চলতি পথের মাঝখানে ঘর থেকে বেরিয়ে ছোট ছোট ছেলে-পুলে মিলে হাত নেড়ে স্বাগতম জানাচ্ছে তাদের। এটাই চিরায়ত সাজেকের দিকে যাত্রাকালের চিত্র। সেই আদিমতা এখন অনেকটাই বিলুপ্ত। পাহাড়ের বুক সমতল করে গৃহপালিত জীবনের স্থায়ী বসতি গড়ে উঠেছে। তবুও জীবনকে সহজ করার প্রক্রিয়াটা এখানে আজও সহজ নয়। পাহাড়ের উপর জীবন এমনিতেই কঠিন। তার ওপর সশস্ত্র বাহিনীর দাপটে জায়গায় জায়গায় আটকে থাকে স্বাভাবিক জীবনপ্রবাহ। দুই-একটি পাকা দালানের নিচে দেখা যায় সেই জীর্ণশীর্ণ বেতের ঘর। ভেতরে চোখ রাখলে বোঝা যায় অভাবে না স্বভাব বসত কারণেই এইরকম শির্ণতা। যেটাই হোক, সরঞ্জাম বলতে হাতে গোনা কয়েকটি জিনিস আর বিশাল প্রকৃতির সান্নিধ্যে এই স্বল্পতা বোধহয় এখানকার মানুষদের কাছে কিছুই নয়। তবুও চোখে পড়ে ঐতিহ্যের রেশ। গামছা আর ব্লাউজ কিংবা টপ পরিহিত পাহাড়ি নারীদের শরীরজুড়ে ঐতিহ্যের স্মৃতি এখনও বেঁচে আছে। ভিড়ের মাঝেও শান্তির খোঁজ ছুটির দিন...

বাবা

একটা উঠান, উঠানের মাঝখানে চাটাই পাতা। সেইখানে শুয়ে আছে আমার জন্মদাতা, আমার বাবা। অনেক বছর আগে, ঠিক এভাবেই শেষ দেখেছিলাম আমার ঠাকুরমাকে বাবার মতোই শুয়ে ছিলো নিথর দেহে, নিষ্প্রাণ হয়ে।  সেদিন আমি অবুঝ ছিলাম  বেদনার বোধ ছিলোনা আমাতে সবার কান্না দেখে কেঁদে যাওয়া,  কিন্ত আজ, বুকের মাঝে পাহাড়সম কষ্টের বুঝা, নিরবিচ্ছিন্ন জলপ্রপাতে হালকা হবার চেষ্টা। কিন্ত কিভাবে, কেমন করে ভুলে যাই? সেই আঙ্গুল, যার অবলম্বনে হাঁটতে শেখা, মেরুদন্ড দাঁড় করিয়ে মানুষ হওয়া।  বাবার শরীর আজকে হীম শীতল, নিথর - শান্ত মনে শয্যাশায়ী,  মনের মধ্যে বাবা হারানোর চির অশান্তির আগুন,  মাঝে মাঝে বিশ্বাস না করলেও করে নিতে হয়,  বাবা হারানোর ব্যথা আমরণ বয়ে বেড়াতে হয়। 

কলরবের গল্প

চাপা পড়ে থাকা নিঃশব্দের মাঝেও এক ধরনের শব্দ থাকে। যেটা কানে নয়, মনে লাগে। মাঝে মাঝে সেই শব্দ শোনার ইচ্ছে জাগে প্রবলভাবে। শহরের ভেতর দাঁড়িয়ে যখন চারপাশে কেবল হর্ন, চেঁচামেচি আর মানুষে-মানুষে মিশে যাওয়া কথার গোলমাল কানে আসে, তখনই মনে হয় কলরবে কলরবে আছে অনেক পার্থক্য। লোকালয়ের কলরব একরকম। সেখানে শব্দ মানেই ব্যস্ততা, তাড়াহুড়া, প্রতিযোগিতা। সবাই কিছু না কিছু পেতে ছুটছে, অথচ সেই পাওয়াটা আসলে কী তা কেউ স্পষ্ট করে জানে না। মানুষের এই মিশ্রিত শব্দের ভেতরে শান্তি নেই; আছে কেবল একরকম কোলাহল, যা ধীরে ধীরে ক্লান্ত করে ফেলে বাঁচার জন্য প্রয়োজনীয় প্রতিটা ইন্দ্রিয়কে। অন্যদিকে আছে আরেক রকম কলরব, যেটা নিরালায় শোনা যায়। পাখিদের মিছিলে ভেসে আসা ডাক, বাতাসে পাতার দোল, গাছের আড়ালে থেকে ভেসে আসা লুকিয়ে থাকা চড়ুই এর শীষ। এই কলরব গোলমাল নয়, বরং একধরনের ছন্দ। তীব্র গরমের দিনে হাপিয়ে পড়া মন যেন সেই সুরেই সামান্য স্বস্তি খুঁজে পায়। দুই কলরবের এই পার্থক্য আসলে আমাদের জীবনবোধের প্রতিচ্ছবি। আমরা প্রতিদিন এমন এক ব্যস্ততার মধ্যে বাঁচি, যেখানে শব্দই আমাদের সঙ্গী, কিন্তু সেই শব্দের ভেতরে কোনো সুর থা...

স্ব+অধীনতা= স্বাধীনতা

  স্বাধীনতা মানে নিজের অধীনতা, নিজের অধীনে নিজেকে রাখা। পরাধীনতা মানে পরের অধীনে থাকা, নিজের ইচ্ছা পরের অধীনে রেখে পূরণ করা। তো স্বাধীনতা চেয়েছিলো তরী। নীল আকাশে থোকা থোকা মেঘের ভীড়ে চিলের উচ্চতায় যে রকমের স্বাধীনতা আছে ঠিক সে রকম। মাথার উপর লাল বেনারসির উড়না ঝুলছে। সিঁথি বেয়ে টিকলিটা তার ভর জানান দিচ্ছে। এই উদাম সিঁথি আজকে লেড ক্রমাইট এর রঙে ভরাট হবে। মাথা নীচু করে বসে বসে ভাবছে সে। বিয়ের দিনে মেয়েদের মাথা নীচু করে রাখতে হয়। এতে সদ্য বিবাহিতার লাজ প্রকাশ পায়। তবে তরীর মোটেও লজ্জা লাগছে না। বিয়ের কথা মনে হতেই সারাদিনের উপোস রাখা ক্লান্ত শরীরে একটা দুল খেলে গেলো। কিন্ত সেটাকে সুখ বা দুঃখের পাল্লায় মাপা থেকে নিজেকে বিরত রাখল সে।  ব্রাহ্মণ পরিবারের মেয়ে সে। বাবা মায়ের একমাত্র বড় মেয়ে। ব্রাহ্মণ পরিবারের মেয়ে বলেই হোক বা অন্য কারণেই হোক ছোটবেলা থেকেই স্বাধীনতা কেমন কমে কমে এসেছে তার জীবনে। ধুম করে বিয়ে হচ্ছে তার, বাবা মায়ের একমাত্র মেয়ের বিয়েতে বাবা মায়ের খরচের কোন বালাই নেই। আর এই একটা দিক দিয়েই মেয়েকে কিছু দিতে কার্পণ্য করেনি তার বাবা-মা। অবশেষে গলার কাটা স...

আলসেমি, বৃষ্টি আর বিদায়ের কথা।

  আলসেমি এক বিশাল ব্যাপার। যাকে একবার গ্রাস করে, তার আর কিছু করতে ইচ্ছে করে না। মনে হয় বল হারিয়ে গেছে, শরীর-মন অবশ। এই রাজ্যের ভারেই নতুন কিছু লেখা থেমে থাকে। ভাবনা আসে, শব্দ জমে, অথচ অলসতার কুয়াশায় সেগুলো বাক্যে গাঁথা হয় না। খোলা জানালার ফাঁক গলে ধুলোর মতো ঢুকে পড়ে আলসেমি, আস্তে আস্তে থিতু হয়, ভারী করে তোলে আবরণ। জরাজীর্ণ জীবনের ওপরে তখন লিখতে চাওয়া মানেই নিস্ফল চেষ্টা। তবু অনেকদিন পর মনে হলো কিছু লিখতে হবে। অনেক কিছু ঘটেছে, ঘুরা হয়েছে, কেটে গেছে সময়। যাপিত জীবনের গল্পে বড় কিছু না থাকলেও, জীবন যেহেতু জীবন—তাকে একটু অলঙ্কার দিয়ে সাজালে ক্ষতি কী? বাইরে তখন বৃষ্টি পড়ছে। এ আগস্ট মাস একদম বৃষ্টির মাস। প্রতিদিন, প্রতিরূপে, সর্বক্ষণ। সমুদ্র সৈকতে, বাড়ির পাশে বিলের জলে, অফিসের ব্যস্ত জানালার কাঁচ বেয়ে নেমেছে বৃষ্টি। এই শহরে প্রতিদিন বৃষ্টি দরকার। এক দিনের অভাবেই গরম যেভাবে চেপে ধরে, অসহ্য লাগে নিঃশ্বাস নিতে। কিন্তু এই বৃষ্টির মাস কেবল ভালো লাগার নয়, বিরহেরও। সময় যেন নিঃশব্দে কেটে যাচ্ছে, সাথে নিয়ে যাচ্ছে আপনজনদের। পরিচিত মুখ একে একে হারিয়ে যাচ্ছে শহর থেকে, দেশ থেকে। সেদ...

বিচ্ছিন্ন আলাপ- ৪

  জীবনের একটি নির্দিষ্ট পর্যায়ে মানুষ এক ধরনের  নিভৃত তা খোঁজে। যেখানে নেই বাহিরের কোলাহল কিংবা কটুবাক্যের গুঞ্জন। এই নিঃসঙ্গতা যেন এক  বিবর - বাহ্যদৃষ্টিতে অন্ধকার, কিন্তু তার গভীরে লুকানো থাকে আত্মজিজ্ঞাসার আলো। অনেকে একে ভয় পায়, ভাবে নিঃসঙ্গতা এক  পিশাচ  যা গিলে ফেলে জীবনের রঙিন দিনগুলো। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে, এই একাকীত্ব আমাদের মধ্যে  সংযম  গড়ে তোলে। নিজেকে নিয়ন্ত্রণ, চিন্তার গভীরতায় ডুব দেওয়ার সুযোগ এনে দেয় এই নিভৃত সময়। জীবনের পথে যখন  কণ্টক  আসে- সমস্যা, কষ্ট, অপমান- তখন এই নিঃসঙ্গতা আমাদের শিখিয়ে দেয় কীভাবে নিজেকে শান্ত রাখতে হয়। বাইরের জগতের  কটুভাষণ  আমাদের আহত করলেও, ভিতরের  অম্লান  শান্তি আমাদের রক্ষা করে। কখনো কখনো এই একাকীত্ব হয়ে ওঠে  কুহেলিকা র মতো। ভিতরের রহস্যময় অরণ্যে হেঁটে যেতে হয় নিজের অস্তিত্বের খোঁজে। তখন আমরা হয়ে যাই  মরুচারী , নির্জন মরুভূমিতে পথ খুঁজতে থাকা ক্লান্ত যাত্রী। এই যাত্রায় হৃদয়ে জন্ম নেয় এক  চাতক  অপেক্ষা—যে শুধু একফোঁটা আত্মজল খুঁজে ফিরছে। সেই জল, যা আমাদের জাগিয়ে তোলে,...