Skip to main content

বিচ্ছিন্ন আলাপ- ৫

 স্বাধীনতা দিবসে একটা স্বাধীন চিন্তা মাথায় এলো।


গ্রামের সবুজ ধানক্ষেতের পাশে বসে, পড়ন্ত বেলার নরম আলো গায়ে মেখে, খালি ও খোলা মাথার কিছু ভাবনা। পাশের ধানগাছের পাতায় জমে থাকা ছোট ছোট শিশিরবিন্দুগুলো যেন হারিয়ে যাওয়া জোনাকির আলোর স্মৃতি ধরে রেখেছে। এক ধরনের শান্ত, নির্মল পরিবেশ, যেখানে স্বাধীনতা অনুভব করা যায়, বলা লাগে না।


কিন্তু শহরে ঢুকতেই সেই অনুভূতিটা কোথায় যেন হারিয়ে যায়।


দিনের গরমে সচিবালয়ের সামনে দিয়ে আসার সময় চোখে পড়ে সারি সারি পোস্টার। সেখান থেকেই মনে পড়ে, আজ স্বাধীনতা দিবস। মনে করিয়ে দেওয়ার এই পদ্ধতিটা আগে যেমন বিরক্তিকর ছিল, এখনও তেমনই আছে। কারণ পোস্টারগুলো স্বাধীনতার কথা বলে, কিন্তু স্বাধীনতার অনুভূতিটা কোথাও থাকে না বা আদতেই থাকে কি? 


আমরা চাইলে অন্য কিছু করতে পারতাম। একটা জার্নি ম্যাপ করা যেত, যেখানে স্বাধীনতার পথচলা দৃশ্যমান হতো। শহরের দেয়ালগুলো কিছুদিনের জন্য স্বাধীনতার রঙে রাঙিয়ে রাখা যেত। অস্থায়ী স্মৃতিস্তম্ভ তৈরি হতে পারত, যেখানে মানুষ থামত, ভাবত, অনুভব করত।


কিন্তু তার বদলে যা হয়, রাস্তাজুড়ে শুভেচ্ছা, ক্ষমতাসীন দলের অমুক তমুকের নামে। স্বাধীনতা যেন একেক সময় একেক জনের হয়ে যায়।


ইতিহাস কিন্তু একটাই। তবু আমরা তাকে ভেঙে নিই, ভাগ করে নিই, নিজের মতো করে দেখি। কখনো বঙ্গবন্ধুকে কেন্দ্র করে, কখনো জিয়াকে কেন্দ্র করে, কিন্তু খুব কমই আমরা পুরো চিত্রটা দেখি।


স্বাধীনতার ঘোষণার ইতিহাস যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি গুরুত্বপূর্ণ সেই সমস্ত মানুষ, যাদের ত্যাগে এই দেশ দাঁড়িয়ে আছে। সম্মানটা হওয়ার কথা ছিল সামগ্রিক, কিন্তু বাস্তবতা হলো, আমরা সেটাকে দলীয় করে ফেলেছি।

আমরা প্রায়ই পরিবর্তনের কথা বলি। কিন্তু পরিবর্তন শুধু ক্ষমতার পালাবদল না, পরিবর্তন হলো সংস্কৃতির ভেতরে।


একটা সুস্থ সাংস্কৃতিক চর্চা হতে পারত, যেখানে মতভেদ থাকবে, তর্ক থাকবে, কিন্তু সম্মানের জায়গাটা অটুট থাকবে। স্বাধীনতা দিবসে অন্তত আমাদের সেই স্বাধীনতাটা থাকা উচিত, যাতে আমরা ইতিহাসের যেকোনো সত্য উচ্চারণ করতে পারি, কাউকে বাদ না দিয়ে, কাউকে চাপা না দিয়ে।


স্বাধীনতা শুধু একটা তারিখ না, একটা দায়। এই দায়, ইতিহাসকে দলীয় রঙে না রাঙানোর। এই দায়, যাদের ত্যাগে এই দেশ, তাদের সবাইকে মনে রাখার।


স্বাধীনতা তখনই পূর্ণতা পায়, যখন আমরা কারও নাম উচ্চারণ করতে ভয় পাই না, আর কাউকে ভুলে যেতে বাধ্য হই না।

Comments

Popular posts from this blog

খামবন্দী মুহূর্ত

তোলা থাক মান-অভিমান, তোলা থাক বাক্সবন্দি কিছু স্বপ্ন, তোলা থাক রাজ্য জুড়ে তোমার নামে বয়ে যাওয়া মাতাল হাওয়া, তোলা থাক মরীচিকার বুকে ভেসে ওঠা তোমার অস্তিত্ব। তোলা থাক কলম, ফুরিয়ে যাক কালি, তোমার নামে লেখা ছোটগল্প, খামবন্দী চিঠির সারি। তোলা থাক গায়ে গা লাগানো, জ্যাম ঠেলে ছুটে চলা রিকশা, তোলা থাক অসমাপ্ত গানের লাইন, চোখে জমে থাকা নির্বাক কথামালা। তোলা থাক রাস্তার মোড়ে একটি নামের প্রতিধ্বনি— যেখানে সময় থমকে দাঁড়ায় তোমার অপেক্ষায়। তোলা থাক সবকিছু, তোলা থাক— যতদিন না জেগে ওঠে ঘুমন্ত শহর তোমার পদধ্বনিতে।

আপনের দিনগুলি

  (তৃতীয় পর্ব) রাত অনেক, প্রচণ্ড শীত বাইরে। কনকনে শীতল হাওয়া বইছে। ঘুম আসছে না আপনের চোখে। বাসার নীচে, কাছাকাছি কোথাও হতে ট্রাক থেকে ইট নামানোর শব্দ কানে ভেসে আসে। এই শহর কখনো নীরব হয়না, রাতেও না। এই শহরের দেওয়ালগুলো কখনও নীরব শান্তির স্বাদ আস্বাদন করতে পারেনা। বিরামহীন শব্দের ভারে শ্রান্ত তাদের দাঁড়িয়ে থাকা। মাঝখানে ক’দিনের জন্য গ্রামের বাড়ি গিয়েছিলো সে। সেখানেও শীত ছিলো তবে শহরের মতো কোলাহল ছিলো না। আর কোলাহল এর অভাবে সেখানে শীতের মাত্রা আরও ভারী, নিঃশব্দের মাত্রা আরও প্রকট। টিনের চালে গাছের পাতা থেকে ঝরে পড়া শিশিরের শব্দ কানে আসত। কখনও দূর থেকে শিয়ালের ডাক, আর সেই ডাকে হঠাত জেগে উঠা গৃহে পালিত হাঁসের ভয় পাওয়া আর্তনাদ। ঘুম জড়িয়ে আসত চোখে।  আজ আপনের চোখে ঘুম নেই। তরীর কথা মনে পড়ছে না তো? তরীর কথা মনে না পড়লেও, স্মৃতিগুলা মনে হয় এই শীতের রাতেও লেপের উষ্ণতা নিয়ে ভর করতে চায় তার উপর। বিছানা ছেড়ে সিগারেট নিয়ে বারান্দায় গিয়ে গ্রীলের বাইরে চোখ রাখল আপন।  এভাবেই দিনের সাথে সাথে রাত কেটে যাচ্ছে তার। কিছুটা ঘোরের মধ্যে, কিছুটা ঘোরের বাইরে। বাসা থেকে অফিস, অফিস থেকে বাসা। ম...

আপনের দিনগুলি

  শীত শেষ। দিন দশেকের কাপুনিতে শীত যেন তার সর্বস্ব দিয়ে গেছে। এখন যা আছে বা যা অনুভূত হচ্ছে, তা হলো শীতকে জিইয়ে রাখার এক অদ্ভুত তাড়না। একসময় Winter is coming বললে একটা গম্ভীর আবহ তৈরি হতো। এখন গরমকাল আসার কথাতেই মানুষের হৃদয় কেঁপে উঠে। যেমনটা আজকাল প্রায়ই কেঁপে উঠে, ঘুমের মধ্যে কিংবা জেগে থাকতেই হঠাৎ করে বিল্ডিং কেঁপে উঠে; ইদানীং ভূমিকম্প হচ্ছে খুব।  গরমকাল মানেই এখন প্রচণ্ড গরম।  উত্তপ্ত চুলার ওপর ভাত যেমন ফটফট শব্দে ফুটতে থাকে, গরমের দিনে শরীরটাও তেমনই সিদ্ধ হতে থাকে। পার্থক্য শুধু এই, এখানে শব্দ শোনা যায় না। সবকিছু ভেতরে ভেতরে ঘুমরে থাকে। ফেব্রুয়ারি মাস চলে এলো। বারো মাসের এক বছরে এই মাসটা আপনের বরাবরের পছন্দের। প্রথমত, মাসটা ছোট। দ্বিতীয়ত, এটা ভালোবাসার মাস, যুগলবন্দী হবার মাস, সরস্বতী পূজার মাস, ভাষা শহীদের মাস, বইমেলার মাস। আর তরীর সঙ্গে প্রথম দেখা হওয়ার মাসও বটে। কিন্তু এই বছরটা কেমন যেন ব্যতিক্রম। শুভ পঞ্চমীর তিথি জানুয়ারিতে পড়ে যাওয়ায় ফেব্রুয়ারি আর সরস্বতী পূজার মাস হলো না। বইমেলাও হচ্ছে না। আরও অনেক কিছুই যেন হলো না। এই মাসটা ক্রমে ‘না-হবার মাস’ হয়ে উঠছে...