স্বাধীনতা দিবসে একটা স্বাধীন চিন্তা মাথায় এলো।
গ্রামের সবুজ ধানক্ষেতের পাশে বসে, পড়ন্ত বেলার নরম আলো গায়ে মেখে, খালি ও খোলা মাথার কিছু ভাবনা। পাশের ধানগাছের পাতায় জমে থাকা ছোট ছোট শিশিরবিন্দুগুলো যেন হারিয়ে যাওয়া জোনাকির আলোর স্মৃতি ধরে রেখেছে। এক ধরনের শান্ত, নির্মল পরিবেশ, যেখানে স্বাধীনতা অনুভব করা যায়, বলা লাগে না।
কিন্তু শহরে ঢুকতেই সেই অনুভূতিটা কোথায় যেন হারিয়ে যায়।
দিনের গরমে সচিবালয়ের সামনে দিয়ে আসার সময় চোখে পড়ে সারি সারি পোস্টার। সেখান থেকেই মনে পড়ে, আজ স্বাধীনতা দিবস। মনে করিয়ে দেওয়ার এই পদ্ধতিটা আগে যেমন বিরক্তিকর ছিল, এখনও তেমনই আছে। কারণ পোস্টারগুলো স্বাধীনতার কথা বলে, কিন্তু স্বাধীনতার অনুভূতিটা কোথাও থাকে না বা আদতেই থাকে কি?
আমরা চাইলে অন্য কিছু করতে পারতাম। একটা জার্নি ম্যাপ করা যেত, যেখানে স্বাধীনতার পথচলা দৃশ্যমান হতো। শহরের দেয়ালগুলো কিছুদিনের জন্য স্বাধীনতার রঙে রাঙিয়ে রাখা যেত। অস্থায়ী স্মৃতিস্তম্ভ তৈরি হতে পারত, যেখানে মানুষ থামত, ভাবত, অনুভব করত।
কিন্তু তার বদলে যা হয়, রাস্তাজুড়ে শুভেচ্ছা, ক্ষমতাসীন দলের অমুক তমুকের নামে। স্বাধীনতা যেন একেক সময় একেক জনের হয়ে যায়।
ইতিহাস কিন্তু একটাই। তবু আমরা তাকে ভেঙে নিই, ভাগ করে নিই, নিজের মতো করে দেখি। কখনো বঙ্গবন্ধুকে কেন্দ্র করে, কখনো জিয়াকে কেন্দ্র করে, কিন্তু খুব কমই আমরা পুরো চিত্রটা দেখি।
স্বাধীনতার ঘোষণার ইতিহাস যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি গুরুত্বপূর্ণ সেই সমস্ত মানুষ, যাদের ত্যাগে এই দেশ দাঁড়িয়ে আছে। সম্মানটা হওয়ার কথা ছিল সামগ্রিক, কিন্তু বাস্তবতা হলো, আমরা সেটাকে দলীয় করে ফেলেছি।
আমরা প্রায়ই পরিবর্তনের কথা বলি। কিন্তু পরিবর্তন শুধু ক্ষমতার পালাবদল না, পরিবর্তন হলো সংস্কৃতির ভেতরে।
একটা সুস্থ সাংস্কৃতিক চর্চা হতে পারত, যেখানে মতভেদ থাকবে, তর্ক থাকবে, কিন্তু সম্মানের জায়গাটা অটুট থাকবে। স্বাধীনতা দিবসে অন্তত আমাদের সেই স্বাধীনতাটা থাকা উচিত, যাতে আমরা ইতিহাসের যেকোনো সত্য উচ্চারণ করতে পারি, কাউকে বাদ না দিয়ে, কাউকে চাপা না দিয়ে।
স্বাধীনতা শুধু একটা তারিখ না, একটা দায়। এই দায়, ইতিহাসকে দলীয় রঙে না রাঙানোর। এই দায়, যাদের ত্যাগে এই দেশ, তাদের সবাইকে মনে রাখার।
স্বাধীনতা তখনই পূর্ণতা পায়, যখন আমরা কারও নাম উচ্চারণ করতে ভয় পাই না, আর কাউকে ভুলে যেতে বাধ্য হই না।
Comments
Post a Comment