"জাহাজের স্টোকার হয়ে চলেছি বিলেতে। ইন্জিনে কয়লা জোগাতে হবে। বলছি বটে ভাবনা করো না, কিন্ত ভাবনা করছো মনে করে ভালো লাগে। তবু বলে রাখি ইঞ্জিনের তাতে পোড়া আমার অভ্যাস আছে। জানি তুমি এই বলে রাগ করবে যে, কেন পাথেয় দাবি করি নি তোমার কাছ থেকে। একমাত্র কারণ এই যে, আমি যে আর্টিস্ট এ পরিচয়ে তোমার একটু শ্রদ্ধা নেই। এ আমার চির দুঃখের কথা; কিন্ত এজন্য তোমাকে দোষ দেব না। আমি নিশ্চয়ই জানি, একদিন সেই রসের দেশের গুণী লোকেরা আমাকে স্বীকার করে নেবে যাদের স্বীকৃতির খাঁটি মূল্য আছে।
অনেক মূঢ় আমার ছবির অন্যায় প্রশংসা করেছে। আবার অনেক মিথ্যুক করেছে ছলনা। তুমি আমার মন ভোলানোর জন্য কোনদিন কৃত্রিম স্তব করনি। তোমার চরিত্রের অটল সত্য থেকে আমি অপরিমেয় দুঃখ পেয়েছি, তবু সেই সত্যকে দিয়েছি আমি বড় মূল্য। একদিন বিশ্বের কাছে যখন সম্মান পাব, তখন সব চেয়ে সত্য সম্মান তুমিই আমাকে দিবে, তার সঙ্গে হৃদয়ের সুধা মিশিয়ে। যতক্ষণ তোমার বিশ্বাস অসন্ধিগ্ধ সত্যে না পৌঁছাবে ততক্ষণ তুমি অপেক্ষা করবে। এই কথা মনে রেখে আয দুঃসাধ্যসাধনার পথে চলেছি।
এতক্ষণে জানতে পেরেছ তোমার হারখানি গেছে চুরি। এ হার তুমি বাজারে বিক্রি করতে যাচ্ছ, এই ভাবনা আমি কিছুতেই সহ্য করতে পারছিলাম না। তুমি পাঁজর ভেঙ্গে সিঁধ কাটতে যাচ্ছিলে আমার মনের মধ্যে। তোমার ওই হারের বদলে আমার একতাড়া ছবি তোমার গয়নার বাক্সের কাছে রেখে এসেছি। মনে মনে হেসো না। বাংলাদেশের কোথাও এই ছবিগুলো ছেড়া কাগজের বেশী দর পাবেনা। অপেক্ষা করো, তুমি ঠকবে না, কখনোই না। হঠাৎ যেমন কোদালের মুখে গুপ্তধন বেরিয়ে পড়ে, আমি জাঁক করে বলছি, তেমনি করে আমার ছবিগুলির দুর্মূল্য দীপ্তি হঠাৎ বেরিয়ে পড়বে। তার আগ পর্যন্ত হেসো, কেননা সব মেয়ের কাছেই সব পুরুষ ছেলেমানুষ - যাদের তারা ভালোবাসে। তোমার সেই স্নিগ্ধ কৌতুকের হাসি আমার কল্পনায় ভরতি করে নিয়ে চললুম সমুদ্রের পারে। আর নিলুম তোমার সেই মধুময় ঘর থেকে একখানি মধুময় অপবাদ। দেখেছি তোমার ভগবানের কাছে তুমি কত দরবার নিয়ে প্রার্থনা কর, এবার থেকে এই প্রার্থনা করো - তোমার কাছ থেকে চলে আসার দারুন দুঃখ যেন একদিন সার্থক হয়।
তুমি মনে মনে কখনো আমাকে ঈর্ষা করেছ কি না জানি না। এ কথা সত্য, মেয়েদের আমি ভালোবাসি। ঠিক ততটা না হোক, মেয়েদের আমার ভালো লাগে। তারা আমাকে ভালোবেসেছে এবং সেই ভালোবাসা আমাকে কৃতজ্ঞ করে। কিন্ত নিশ্চয় তুমি জানো যে, তারা নীহারিকামন্ডলী, তার মাঝখানে তুমি একটিমাত্র ধ্রুবনক্ষত্র। তারা আভাস, তুমি সত্য। এ সব কথা শোনাবে সেন্টিমেন্টাল। উপায় নেই, আমি কবি নই। আমার ভাষাটা কলার ভেলার মতো, ঢেউ লাগলেই বাড়াবাড়ি করে দোল দিয়ে। জানি বেদনার যেখানে গভীরতা সেখানে গম্ভীর হওয়া চাই, নাইলে সত্যের মর্যাদা থাকেনা। দুর্বলতা চঞ্চল, অনেকবার আমার দুর্বলতা দেখে হেসেছ। এই চিঠিতে তারই লক্ষণ দেখে বলবে এইতো ঠিক তোমার আমির মতোই ভাবখানা। কিন্ত এবার হয়তো তোমার মুখে হাসি আসবে না। তোমাকে পাইনি বলে অনেক খুঁতখুঁত করেছি, কিন্ত হৃদয়ের দানে তুমি যে কৃপণ এ কথার মতো এর অবিচার আর কিছু হতে পারে না। আসলে এ জীবনে তোমার কাছে আমার সম্পূর্ণ প্রকাশ হতে পারল না। হয়তো কখনো হতে পারবো না। এই তীব্র অতৃপ্তি আমাকে এমন কাঙাল করে রেখেছে। সেই জন্যই আর কিছু বিশ্বাস করি বা না করি, হয়তো জন্মান্তরে বিশ্বাস করতে হবে। তুমি স্পষ্ট করে আমাকে তোমার ভালোবাসা জানাও নি, কিন্ত তোমার স্তব্ধতার গভীর থেকে প্রতিক্ষণে যা তুমি দান করেছ, এই নাস্তিক তাকে কোন সংজ্ঞা দিতে পারে নি— বলেছে ‘অলৌকিক’। এরই আকর্ষণে কোন এক ভাবে হয়তো তোমার ভগবানেরই কাছাকাছি ফিরেছি। ঠিক জানি নে। হয়তো সবই বানানো কথা। কিন্ত হৃদয়ের একটা গোপন জায়গা আছে আমাদের নিজেদেরই অগোচরে, সেখানে প্রবল ঘা লাগলে কথা আপনি বানিয়ে ওঠে, হয়তো সে এমন কোনো সত্য যা এতদিনে নিজে জানতে পারি নি।
এই জগতে সবচেয়ে ভালোবেসেছি তোমাকে। সেই ভালোবাসার কোন একটা অসীম সত্যভূমিকা আছে বলে যদি মনে করা যায়, আর তাকেই যদি বল তোমাদের ঈশ্বর, তা হলে তাঁর দুয়ার আর তোমার দুয়ার এক হয়ে রইল এই নাস্তিকের জন্যে। আবার আমি ফিরব— তখন আমার মত, আমার বিশ্বাস, সমস্ত চোখ বুজে সমর্পণ করে দেব তোমার হাতে; তুমি তাকে পৌঁছে দিয়ো তোমার তীর্থপথের শেষ ঠিকানায়, যাতে বুদ্ধির বাধা নিয়ে তোমার সঙ্গে এক মুহুর্তের বিচ্ছেদ আর কখনো না ঘটে। তোমার কাছ থেকে দূরে থেকে ভালোবাসার অভাবনীয়তা উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে আমার মনের মধ্যে, যুক্তিতর্কের কাঁটার বেড়া পার করিয়ে দিয়েছে আমাকে—আমি দেখতে পাই তোমাকে লোকাতীত মহিমায়। এতদিন বুঝতে চেয়েছিলুম বুদ্ধি দিয়ে, এবার পেতে চাই আমার সমস্তকে দিয়ে। "
(বিভাকে লেখা অভীকের চিঠি)
রবিবার
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর।
Comments
Post a Comment