Skip to main content

Umwelt

 আমরা প্রায়ই বলি আমরা সবাই একই পৃথিবীতে বাস করি। একই আকাশ, একই বাতাস, একই শহর কিংবা একই রাস্তা। কিন্তু একটু থামলে, ভেবে দেখলে বলে ফেলা কথাটার অর্থ আস্তে আস্তে বদলে যায়। আমরা সবাই একই পৃথিবীতে থাকি, কিন্তু সত্যিই কি আমরা একই পৃথিবী দেখি? এই প্রশ্নটাই মাথায় আসে, যখন ‘Umwelt’ শব্দটার সঙ্গে প্রথম পরিচয় হয়।

‘Umwelt’ আসলে একটি জার্মান শব্দ, যার অর্থ চারপাশের পৃথিবী বা পরিবেষ্টিত জগত। আরও সহজ করে বললে, একটি জীব যেভাবে তার চারপাশের পরিবেশকে উপলব্ধি করে, সেই স্বতন্ত্র উপলব্ধির জগৎই তার ‘Umwelt’। অর্থাৎ, এক জীব থেকে আরেক জীব, এমনকি এক মানুষ থেকে আরেক মানুষে, এই ‘Umwelt’ ভিন্ন হয়ে ওঠে।

আর তাই একই বিকেলের আলো কারও কাছে শান্তির, কারও কাছে বিষণ্ণতার। একই বৃষ্টির শব্দ কেউ ভালোবাসে, কেউ এড়িয়ে চলে। একটা ফুল কারও চোখে সৌন্দর্য, কারও কাছে শুধু একটি জৈবিক গঠন, আবার কারও কাছে ক্ষণস্থায়ী জীবনের প্রতীক। বস্তুটা এক, কিন্তু তার মানে এক নয়।

আমরা প্রত্যেকে আসলে নিজের ভেতরে একটি আলাদা জগৎ বহন করি। একটি নিজস্ব অনুভবের পরিসর, যেখানে আমাদের স্মৃতি, অভিজ্ঞতা, ভয়, ভালোবাসা সবকিছু মিলে তৈরি করে আমাদের দেখা ও উপলব্ধির ধরন।

সমস্যাটা হয় তখনই, যখন আমরা ধরে নিই আমার দেখা পৃথিবীটাই সবার জন্য সত্য। আমরা ভাবি অন্যরাও ঠিক আমার মতো করেই অনুভব করছে, বুঝছে, দেখছে। অথচ সত্যিটা হলো আমরা কেউই পুরোপুরি অন্য কারও জগতে প্রবেশ করতে পারি না। আমরা পাশাপাশি হাঁটি, কথা বলি, সম্পর্ক গড়ে তুলি, কিন্তু প্রত্যেকেই নিজের উমভেল্টের ভেতরেই সীমাবদ্ধ থাকি।

হয়তো এ কারণেই অনেক সময় খুব কাছের মানুষকেও পুরোটা বোঝা যায় না। একই মুহূর্তে থেকেও অনুভূতিগুলো আলাদা থাকে। কেউ কিছু হারানোর ভয় পায়, কেউ একই জিনিসে মুক্তি খুঁজে পায়। একই নীরবতা কারও কাছে শান্তি, কারও কাছে ভারী শূন্যতা।

তবে এই সীমাবদ্ধতাটার ভেতরেই একটা অদ্ভূত সৌন্দর্য আছে। কারণ যদি আমরা সত্যিই একইভাবে সবকিছু অনুভব করতাম, তাহলে হয়তো পৃথিবীটা এত বৈচিত্র্যময় হতো না। এই ভিন্ন ভিন্ন উমভেল্টই আমাদের আলাদা করে, আবার একসাথে থাকার একটা নতুন মানে তৈরি করে। বোঝার চেষ্টা, শোনার চেষ্টা, আর কখনো কখনো মেনে নেওয়ার চেষ্টা।

শেষ পর্যন্ত হয়তো আমরা একই পৃথিবীতে বাস করি না। আমরা বাস করি অসংখ্য ভিন্ন পৃথিবীর ভেতর, যেগুলো কখনো একে অপরকে ছুঁয়ে যায়, কিন্তু পুরোপুরি মিশে যেতে পারে না।


#umwelt 


Comments

Popular posts from this blog

খামবন্দী মুহূর্ত

তোলা থাক মান-অভিমান, তোলা থাক বাক্সবন্দি কিছু স্বপ্ন, তোলা থাক রাজ্য জুড়ে তোমার নামে বয়ে যাওয়া মাতাল হাওয়া, তোলা থাক মরীচিকার বুকে ভেসে ওঠা তোমার অস্তিত্ব। তোলা থাক কলম, ফুরিয়ে যাক কালি, তোমার নামে লেখা ছোটগল্প, খামবন্দী চিঠির সারি। তোলা থাক গায়ে গা লাগানো, জ্যাম ঠেলে ছুটে চলা রিকশা, তোলা থাক অসমাপ্ত গানের লাইন, চোখে জমে থাকা নির্বাক কথামালা। তোলা থাক রাস্তার মোড়ে একটি নামের প্রতিধ্বনি— যেখানে সময় থমকে দাঁড়ায় তোমার অপেক্ষায়। তোলা থাক সবকিছু, তোলা থাক— যতদিন না জেগে ওঠে ঘুমন্ত শহর তোমার পদধ্বনিতে।

আপনের দিনগুলি

  (তৃতীয় পর্ব) রাত অনেক, প্রচণ্ড শীত বাইরে। কনকনে শীতল হাওয়া বইছে। ঘুম আসছে না আপনের চোখে। বাসার নীচে, কাছাকাছি কোথাও হতে ট্রাক থেকে ইট নামানোর শব্দ কানে ভেসে আসে। এই শহর কখনো নীরব হয়না, রাতেও না। এই শহরের দেওয়ালগুলো কখনও নীরব শান্তির স্বাদ আস্বাদন করতে পারেনা। বিরামহীন শব্দের ভারে শ্রান্ত তাদের দাঁড়িয়ে থাকা। মাঝখানে ক’দিনের জন্য গ্রামের বাড়ি গিয়েছিলো সে। সেখানেও শীত ছিলো তবে শহরের মতো কোলাহল ছিলো না। আর কোলাহল এর অভাবে সেখানে শীতের মাত্রা আরও ভারী, নিঃশব্দের মাত্রা আরও প্রকট। টিনের চালে গাছের পাতা থেকে ঝরে পড়া শিশিরের শব্দ কানে আসত। কখনও দূর থেকে শিয়ালের ডাক, আর সেই ডাকে হঠাত জেগে উঠা গৃহে পালিত হাঁসের ভয় পাওয়া আর্তনাদ। ঘুম জড়িয়ে আসত চোখে।  আজ আপনের চোখে ঘুম নেই। তরীর কথা মনে পড়ছে না তো? তরীর কথা মনে না পড়লেও, স্মৃতিগুলা মনে হয় এই শীতের রাতেও লেপের উষ্ণতা নিয়ে ভর করতে চায় তার উপর। বিছানা ছেড়ে সিগারেট নিয়ে বারান্দায় গিয়ে গ্রীলের বাইরে চোখ রাখল আপন।  এভাবেই দিনের সাথে সাথে রাত কেটে যাচ্ছে তার। কিছুটা ঘোরের মধ্যে, কিছুটা ঘোরের বাইরে। বাসা থেকে অফিস, অফিস থেকে বাসা। ম...

আপনের দিনগুলি

  শীত শেষ। দিন দশেকের কাপুনিতে শীত যেন তার সর্বস্ব দিয়ে গেছে। এখন যা আছে বা যা অনুভূত হচ্ছে, তা হলো শীতকে জিইয়ে রাখার এক অদ্ভুত তাড়না। একসময় Winter is coming বললে একটা গম্ভীর আবহ তৈরি হতো। এখন গরমকাল আসার কথাতেই মানুষের হৃদয় কেঁপে উঠে। যেমনটা আজকাল প্রায়ই কেঁপে উঠে, ঘুমের মধ্যে কিংবা জেগে থাকতেই হঠাৎ করে বিল্ডিং কেঁপে উঠে; ইদানীং ভূমিকম্প হচ্ছে খুব।  গরমকাল মানেই এখন প্রচণ্ড গরম।  উত্তপ্ত চুলার ওপর ভাত যেমন ফটফট শব্দে ফুটতে থাকে, গরমের দিনে শরীরটাও তেমনই সিদ্ধ হতে থাকে। পার্থক্য শুধু এই, এখানে শব্দ শোনা যায় না। সবকিছু ভেতরে ভেতরে ঘুমরে থাকে। ফেব্রুয়ারি মাস চলে এলো। বারো মাসের এক বছরে এই মাসটা আপনের বরাবরের পছন্দের। প্রথমত, মাসটা ছোট। দ্বিতীয়ত, এটা ভালোবাসার মাস, যুগলবন্দী হবার মাস, সরস্বতী পূজার মাস, ভাষা শহীদের মাস, বইমেলার মাস। আর তরীর সঙ্গে প্রথম দেখা হওয়ার মাসও বটে। কিন্তু এই বছরটা কেমন যেন ব্যতিক্রম। শুভ পঞ্চমীর তিথি জানুয়ারিতে পড়ে যাওয়ায় ফেব্রুয়ারি আর সরস্বতী পূজার মাস হলো না। বইমেলাও হচ্ছে না। আরও অনেক কিছুই যেন হলো না। এই মাসটা ক্রমে ‘না-হবার মাস’ হয়ে উঠছে...