Skip to main content

অস্বাভাবিকতার অসাড় চক্র

 আমাদের মধ্যে স্বাভাবিক জিনিস অস্বাভাবিক ভাবে দেখার একটা প্রবণতা তৈরি হয়েছে। যেমন স্বাভাবিক ভাবে দেখা একটা সবুজ নারিকেল সবুজ থাকলেই আর যথেষ্ট হচ্ছেনা। তাকে বেগুনি করতে হবে, কখনো লাল, কখনো নীল। কারণ, এটি এখন আর শুধু একটা নারিকেল নয়; একটা কনটেন্ট। আর স্বাভাবিক জিনিসকে কন্টেন্টের নামে অস্বাভাবিক করে তোলার মধ্যে আমাদের এক ধরনের কৌতূহল, বা উচ্ছ্বাস কাজ করে। কিন্তু নারিকেলের গায়ে বেগুনি, লাল কিংবা নীল রং লাগালেই তো তার প্রকৃতি বদলে যায় না। তার ভেতরের জল, তার স্বাভাবিকতা, তার প্রকৃতি প্রদত্ত সত্তা একই থেকে যায়। বদলায় শুধু আমাদের দেখার পদ্ধতি। 


আর সমস্যার শুরু সেখানেই।


আমরা ক্রমেই স্বাভাবিক জিনিস আর স্বাভাবিকভাবে দেখছি না। প্রকৃতির রূপ আর রং যথেষ্ট মনে হচ্ছেনা আমাদের কাছে, তাই তাকে পরিবর্তন করে কত্রিমতার আশ্রয়ে নতুন রূপে রাঙ্গিয়ে দিচ্ছি। স্বাভাবিক ঘটনা যথেষ্ট উত্তেজক নয়, তাই তাকে নাটকীয় করে তুলছি। সাধারণ জীবন যথেষ্ট আকর্ষণীয় নয়, তাই তার চারপাশে কৃত্রিমতা তৈরি করছি। আর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম উত্তেজকের আসনে বসে আমাদের উত্তেজনা আরো বাড়িয়ে দিচ্ছে। 


কৌতুহল মানুষের স্বাভাবিক প্রবৃত্তি। আর এই কৌতূহলকে প্রতিদিন, প্রতিমুহুর্তে উসকে দেওয়ার জন্য আছে ফেসবুক, ইউটিউব, ইন্সটাগ্রাম বা এইরকম আরো মাধ্যম। যাদের কল্যাণে আমাদের নতুন কিছু দেখার ক্ষুধা বেড়ে যাচ্ছে । আমরা আরও অদ্ভুত কিছু দেখতে চাই, আরও ভয়ংকর কিছু জানতে চাই, আরও গোপন কিছুতে উঁকি দিতে চাই। স্বাভাবিকতা আমাদের আর খুব বেশি আলোড়িত করে না। 


সম্ভবত এই কারণে আমাদের বোধও ধীরে ধীরে অসাড় হয়ে যাচ্ছে। 


আমরা বোধ-জ্ঞান শূন্য হয়ে যাচ্ছি। এই যে এক পরিবারের সবাই খুন হলো কিংবা আড়াই মাসের মেয়ে বাচ্চা থেকে শুরু করে লিপ্সিতের থাবা থেকে না বাঁচা অনেক মেয়ে কিংবা বস্তা ভর্তি ছোট ছোট টুকরায় ছিন্নভিন্ন দেহ কিংবা এরকম আরও কত অস্বাভাবিকতার চাঁদরে আমরা নিজেদের মুড়িয়ে নিচ্ছি বলা মুশকিল। মানুষ অবশ্য নতুন করে হত্যাকারী হয়নি। হত্যার ইতিহাস মানবসভ্যতার ইতিহাসের মতোই পুরোনো। কিন্তু এখন কেন যেন হত্যার ধরন, তার প্রকাশ এবং তার মাত্রা বদলে গেছে বলে মনে হয়। সামান্য বিরোধে রক্তপাত, ক্ষণিকের উত্তেজনায় প্রাণ নেওয়া, আর তার মধ্যেও আছে যেন এক ধরনের উগ্র প্রদর্শন।এই উগ্রতা, তার ধরন ও মাত্রা কেমন জানি অস্বাভাবিক ঠেকছে। 


আর স্মার্টফোন আমাদের এই অস্বাভাবিকতাকে নতুন শক্তি দিয়েছে। 


এখন প্রায় সবার হাতেই মোবাইল আছে বা বলা ভালো মোবাইলের দিকে তাকিয়েই এখন সবাই হাঁটাচলা করে, মোবাইল তাক করে রাখে, হয় মুখের দিকে নাইলে পথের। মোবাইল হয়ে যাচ্ছে পরিস্থিতির সাক্ষী, কারও জন্য অস্ত্র, কারও জন্য অর্থ উপার্জনের মাধ্যম। মানুষের ব্যক্তিগত জীবন থেকে শুরু করে দুর্ঘটনা, মারামারি, হত্যা, নির্যাতন থেকে শুরু করে সবকিছুই এখন মুহূর্তের মধ্যে কনটেন্ট হয়ে যেতে পারে। পাশের বাসার গোপন ভিডিও, রাস্তায় ঘটে যাওয়া সহিংসতা, কারও ব্যক্তিগত বিপর্যয় সবকিছুরই যেন দর্শক আছে, বাজার আছে, কনটেন্ট ভ্যালু আছে। এইযে এক লোক রাস্তায় বসে ভাত খাচ্ছে এটাও একটা কন্টেন্ট। 


ঘরে বসে সামাজিক মাধ্যমে যোগ থাকার কারণে আমরা জেনে যাচ্ছি সব। কার ঘরে কী ঘটছে, কে কাকে মারল, কোথায় কার দেহ পাওয়া গেল, কে কী করল কিছুই আর আমাদের চোখ এড়াচ্ছে না। কিন্ত এত কিছু দেখতে দেখতে বা জানতে জানতে কি আমরা সচেতন হচ্ছি না অধিক জেনে যাবার কারণে ধীরে ধীরে আমরা আরও অস্থির, বিরক্ত এবং অনুভূতিশূন্য হয়ে যাচ্ছি? 


হয়তো আমরা প্রতিদিন এত বেশি উত্তেজনা, সহিংসতা, যৌনতা, গুজব এবং অস্বাভাবিকতার মুখোমুখি হচ্ছি যে আমাদের স্বাভাবিক বোধের সীমা বদলে যাচ্ছে। যা একসময় আমাদের শিউরে উঠতে বাধ্য করত, তা এখন কয়েক সেকেন্ডের একটি রিল। আমরা দেখি, বিস্মিত হই, আফসোস করি, কমেন্ট করি তারপর পরের ভিডিওতে চলে যাই। 

আবার দেখি। আবার আফসোস করি। আবার ভুলে যাই।

এইভাবেই হয়তো আমরা একটা চক্রে ঢুকে পড়ছি যেখানে অস্বাভাবিকতা আমাদের বিনোদন দেয়, সহিংসতা আমাদের কৌতূহল জাগায়, কৃত্রিমতা আমাদের আকৃষ্ট করে, আর বাস্তবতা ধীরে ধীরে আমাদের অনুভূতিকে ক্লান্ত করে দেয়।

তো একটা সবুজ নারিকেলকে বেগুনি, লাল কিংবা নীল করে তুললেও নারিকেলের প্রকৃতি বদলায় না। কিন্তু যখন আমরা প্রতিনিয়ত সবকিছুর আসল রং বদলে দিতে থাকি, তখন একসময় হয়তো বদলে যায় আমাদের দেখার চোখ। আর সবচেয়ে ভয়ংকর ব্যাপারটি সম্ভবত সেটাই। কারণ, একসময় এই অস্বাভাবিকতাই আমাদের কাছে স্বাভাবিক হয়ে যাবে।

আর আমরা দেখতে দেখতে কোনো কিছুই আর সত্যিকার অর্থে দেখতে পাব না।  অস্বাভাবিকতার এক অসাড় চক্রে আমরা ধীরে ধীরে আষ্টে-পৃষ্টে জড়িয়ে যাব। 


Comments

Popular posts from this blog

আপনের দিনগুলি-০৩

  (তৃতীয় পর্ব) রাত অনেক, প্রচণ্ড শীত বাইরে। কনকনে শীতল হাওয়া বইছে। ঘুম আসছে না আপনের চোখে। বাসার নীচে, কাছাকাছি কোথাও হতে ট্রাক থেকে ইট নামানোর শব্দ কানে ভেসে আসে। এই শহর কখনো নীরব হয়না, রাতেও না। এই শহরের দেওয়ালগুলো কখনও নীরব শান্তির স্বাদ আস্বাদন করতে পারেনা। বিরামহীন শব্দের ভারে শ্রান্ত তাদের দাঁড়িয়ে থাকা। মাঝখানে ক’দিনের জন্য গ্রামের বাড়ি গিয়েছিলো সে। সেখানেও শীত ছিলো তবে শহরের মতো কোলাহল ছিলো না। আর কোলাহল এর অভাবে সেখানে শীতের মাত্রা আরও ভারী, নিঃশব্দের মাত্রা আরও প্রকট। টিনের চালে গাছের পাতা থেকে ঝরে পড়া শিশিরের শব্দ কানে আসত। কখনও দূর থেকে শিয়ালের ডাক, আর সেই ডাকে হঠাত জেগে উঠা গৃহে পালিত হাঁসের ভয় পাওয়া আর্তনাদ। ঘুম জড়িয়ে আসত চোখে।  আজ আপনের চোখে ঘুম নেই। তরীর কথা মনে পড়ছে না তো? তরীর কথা মনে না পড়লেও, স্মৃতিগুলা মনে হয় এই শীতের রাতেও লেপের উষ্ণতা নিয়ে ভর করতে চায় তার উপর। বিছানা ছেড়ে সিগারেট নিয়ে বারান্দায় গিয়ে গ্রীলের বাইরে চোখ রাখল আপন।  এভাবেই দিনের সাথে সাথে রাত কেটে যাচ্ছে তার। কিছুটা ঘোরের মধ্যে, কিছুটা ঘোরের বাইরে। বাসা থেকে অফিস, অফিস থেকে বাসা। ম...

আপনের দিনগুলি-০৪

  শীত শেষ। দিন দশেকের কাপুনিতে শীত যেন তার সর্বস্ব দিয়ে গেছে। এখন যা আছে বা যা অনুভূত হচ্ছে, তা হলো শীতকে জিইয়ে রাখার এক অদ্ভুত তাড়না। একসময় Winter is coming বললে একটা গম্ভীর আবহ তৈরি হতো। এখন গরমকাল আসার কথাতেই মানুষের হৃদয় কেঁপে উঠে। যেমনটা আজকাল প্রায়ই কেঁপে উঠে, ঘুমের মধ্যে কিংবা জেগে থাকতেই হঠাৎ করে বিল্ডিং কেঁপে উঠে; ইদানীং ভূমিকম্প হচ্ছে খুব।  গরমকাল মানেই এখন প্রচণ্ড গরম।  উত্তপ্ত চুলার ওপর ভাত যেমন ফটফট শব্দে ফুটতে থাকে, গরমের দিনে শরীরটাও তেমনই সিদ্ধ হতে থাকে। পার্থক্য শুধু এই, এখানে শব্দ শোনা যায় না। সবকিছু ভেতরে ভেতরে ঘুমরে থাকে। ফেব্রুয়ারি মাস চলে এলো। বারো মাসের এক বছরে এই মাসটা আপনের বরাবরের পছন্দের। প্রথমত, মাসটা ছোট। দ্বিতীয়ত, এটা ভালোবাসার মাস, যুগলবন্দী হবার মাস, সরস্বতী পূজার মাস, ভাষা শহীদের মাস, বইমেলার মাস। আর তরীর সঙ্গে প্রথম দেখা হওয়ার মাসও বটে। কিন্তু এই বছরটা কেমন যেন ব্যতিক্রম। শুভ পঞ্চমীর তিথি জানুয়ারিতে পড়ে যাওয়ায় ফেব্রুয়ারি আর সরস্বতী পূজার মাস হলো না। বইমেলাও হচ্ছে না। আরও অনেক কিছুই যেন হলো না। এই মাসটা ক্রমে ‘না-হবার মাস’ হয়ে উঠছে...

A Ruined Rose

  My days were fading away Like a rose forgotten, Between the warm pages of a book. Or  a rose lying silently  Upon the desk of a desolate soul, Slowly surrendering  To the quiet heat of the morning sun. Slowly it withered,  Losing fragrance, color and grace Until nothing remained  But the faint memory of a rose. Sometimes a life, too, Disappears in such silence.