Skip to main content

সিনেমার গল্প

 “মে ভাপাস আউঙ্গা”- আমি আবার আসব। 

ভারতবর্ষ ভাগ নিয়ে আরও একটা ছবি দেখলাম। ভালোই লাগল সিনেমাটা। আগের মতো এখন আর  নিয়ম করে সিনেমা দেখা হয়না। মাঝে মাঝে নির্বাচিত কিছু সিনেমা দেখা আর কি। মানে আগ্রহ তৈরি করতে পারলেই তবে সেটা দেখা। এই সিনেমাটা দেখার পেছনে যে আগ্রহ তৈরি হয়েছে সেটা মূলত এই ছবির একটা গান থেকে। 

“জ্যায়সে তু হ্যায় পাস মেরি,

তেরে পাস ম্যায়,

জ্যায়সে শাম কে সাভেরে,

তেরে পাস ম্যায়…” 


গানটা প্রথম শুনার পর থেকেই মনে কেমন একটা অনুভূতি খেলে গেলো। মনে হচ্ছিলো, শব্দগুলো যেন আমার মনের মধ্যে আগে থেকেই থাকা কিছু কথার বোনন দেখিয়ে গেলো। চলতে চলতে একটু আনমনা হয়ে যাওয়ার মতো অবস্থা। তারপর একটা গান একবার ভালো লেগে গেলে বারবার শোনা। তেমনই কতবার যে গানটা শোনা হয়েছে তার কোন হিসাব আর না করলাম।  

সিনেমার গল্পটা দেশভাগের সময়কার। এক শিখ ছেলে আর এক মুসলমান মেয়ের মধ্যে দেশভাগের সময় গড়ে উঠা প্রণয় ও পরিণতি নিয়েই এই সিনেমা। যদিও সময়টা সুসময় ছিলোনা। জাতিগত দাঙ্গার দোলনচলে দোলে উঠে তাদের প্রেম।

অসম প্রেমের গল্পগুলো কেমন জানি অমিল থাকে সবসময়। একে তো থাকে সমাজের বাধা, তারপর পরিবার, পরিজন সর্বোপরি পুরো পরিবেশ। কিন্তু সবাই জানে বা বুঝে যে টান তৈরি হতে আসলে ধর্ম, বর্ণ, জাত বা পাত কিছুই লাগেনা। ভালোবাসা এমনিতেই চলে আসে। এই ভালোবাসাও আসলে কেউ বুঝে উঠেনি। কিন্তু গল্প হয়ে উঠেছে আর গল্পে না দেখালে আমরা কোন কাহিনী কতটা গভীর ছিলো সেটা বুঝে উঠতে পারিনা। 

ঘটনা কি ঘটেছিলো সেটা মুভি দেখলেই বুঝা যাবে কিন্তু সেই সময়টার চিন্তা আসে মাথার মধ্যে আর সেটাই বেশী ভয়ংকর। একটা সময়, মানুষকে হুট করে সবকিছু গুছিয়ে নিজের, আপনজনদের নিয়ে পালাতে হয়েছে। নিজের বাড়ি, তা কেন্দ্র করে গড়ে উঠা পরিচিত বাস্তসংস্থান, সবকিছু পেছনে ফেলে।

এমন মানুষদের হাতের তরবারি থেকে পালাতে হচ্ছে যাদের সাথে কিছুদিন আগে হয়তো দোকানে আড্ডা দেওয়া হয়েছে, এক সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করা হয়েছে। এমন পরিস্থিতি যেখানে হুট করে বন্ধু শত্রু হয়ে যায়, হয়ে যায় হত্যাকারী। গল্পের নায়ক কিনুকেও পালাতে হয়েছে, তার পরিবারকে সাথে নিয়ে, আর প্রিয়জন জিয়াকে পিছনে ফেলে। যেতে যেতে বলে যায় সে আবার আসবে। গিজ গিজ মানুষ ভর্তি ট্রেনের ছাদে দাঁড়িয়ে সেই ফিরে আশার আর্তচিৎকারের মধ্যেই সিনেমার আসল দৃশ্যপট ভেসে উঠে। 

সেদিন মানচিত্রে একটা দেশের মধ্যে একটা সীমারেখা টানা হয়েছিলো, যেটা শুধু একটা ভূখন্ডই ভাগ করেনি, খন্ড-বিখন্ড করে দিয়েছিলো মানুষের বাড়িঘর, সম্পর্ক। আর সেই বিভক্তির মধ্যেই কোন কোন ভালবাসার সম্পর্ক অসম্পূর্ণ থেকে গিয়েছিলো। এই অসম্পূর্ণ ভালোবাসার কথা বলতে গিয়েই সিনেমার আরেক চরিত্র দিলজিতকে বলতে শোনা যায়- “ভালোবাসা বিষের মতো, এর এক ফোঁটাও যদি ভেতরে থেকে যায়, জীবনের শেষ সময়েও এটা মানুষকে শান্তিতে মরতে দেয়না।”

ভালোবাসা যদি পূর্ণতা পায়, তাহলে তার একটা পরিণতি থাকে। কিন্ত যে ভালোবাসা অসম্পূর্ণ, তার কোন শেষ থাকেনা। কিনু বড় হয়, সময় সামনে এগিয়ে যায়, আশেপাশের মানুষ আর পরিবেশ বদলে যায় কিন্ত কিছু অসম্পূর্ণ ইচ্ছা থেকে যায় চিরসবুজ, বয়সের ভারে যেটা ভারাক্রান্ত হয়না। কিনুর ইচ্ছা ছিলো ফিরে যাবার, তাই বুড়া বয়সেও সে ফিরে যেতে চেয়েছিলো তার ফেলে আসা অসম্পূর্ণ ইচ্ছার কাছে, তার ভালোবাসার মানুষটার কাছে। 

দেশভাগ নিয়ে আমরা ইতিহাস পড়ি। কত মানুষ মারা গিয়েছিল, কত মানুষ উদ্বাস্ত হয়েছিলো, কত মানুষের ঘর পুড়েছিলো। সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার এক জলজ্যান্ত উদাহরণ, যার ফলে সৃষ্ট ক্ষত এখনও মানুষকে তাড়িয়ে বেড়ায়। বইয়ের পাতা লেখা সংখ্যায় কিংবা বর্ননায় সেই সত্য, সেই পরিস্থিতি উপলদ্ধি করা কঠিন। কত মানুষ যে একে অপরের কাছে থেকেও কাছে থাকতে পারেনি, তার কোনো হিসাব নেই। 

দেশভাগের সবচেয়ে বড় নিষ্ঠুরতা হয়ত এটাই যে, সে মানুষকে শুধু ঘর থেকেই উচ্ছেদ করেনি, উচ্ছেদ করেছে তাদের ভবিষ্যৎ থেকেও। কারও ঘর অন্য দেশে পড়ে রইল, কারও প্রিয় মানুষ অন্য ধর্মের পরিচয়ে আটকে গেল, কারও ভালোবাসা সময়ের কাছে নয়, একটি কৃত্রিম সীমারেখার কাছে পরাজিত হলো।  

তবু ভালোবাসা পুরোপুরি হারিয়ে যায়না, পরাজিতও হয়না। বারবার ফিরে আশার চেষ্টায় সদা থাকে জাগ্রত।


Comments

Popular posts from this blog

আপনের দিনগুলি-০৩

  (তৃতীয় পর্ব) রাত অনেক, প্রচণ্ড শীত বাইরে। কনকনে শীতল হাওয়া বইছে। ঘুম আসছে না আপনের চোখে। বাসার নীচে, কাছাকাছি কোথাও হতে ট্রাক থেকে ইট নামানোর শব্দ কানে ভেসে আসে। এই শহর কখনো নীরব হয়না, রাতেও না। এই শহরের দেওয়ালগুলো কখনও নীরব শান্তির স্বাদ আস্বাদন করতে পারেনা। বিরামহীন শব্দের ভারে শ্রান্ত তাদের দাঁড়িয়ে থাকা। মাঝখানে ক’দিনের জন্য গ্রামের বাড়ি গিয়েছিলো সে। সেখানেও শীত ছিলো তবে শহরের মতো কোলাহল ছিলো না। আর কোলাহল এর অভাবে সেখানে শীতের মাত্রা আরও ভারী, নিঃশব্দের মাত্রা আরও প্রকট। টিনের চালে গাছের পাতা থেকে ঝরে পড়া শিশিরের শব্দ কানে আসত। কখনও দূর থেকে শিয়ালের ডাক, আর সেই ডাকে হঠাত জেগে উঠা গৃহে পালিত হাঁসের ভয় পাওয়া আর্তনাদ। ঘুম জড়িয়ে আসত চোখে।  আজ আপনের চোখে ঘুম নেই। তরীর কথা মনে পড়ছে না তো? তরীর কথা মনে না পড়লেও, স্মৃতিগুলা মনে হয় এই শীতের রাতেও লেপের উষ্ণতা নিয়ে ভর করতে চায় তার উপর। বিছানা ছেড়ে সিগারেট নিয়ে বারান্দায় গিয়ে গ্রীলের বাইরে চোখ রাখল আপন।  এভাবেই দিনের সাথে সাথে রাত কেটে যাচ্ছে তার। কিছুটা ঘোরের মধ্যে, কিছুটা ঘোরের বাইরে। বাসা থেকে অফিস, অফিস থেকে বাসা। ম...

আপনের দিনগুলি-০৪

  শীত শেষ। দিন দশেকের কাপুনিতে শীত যেন তার সর্বস্ব দিয়ে গেছে। এখন যা আছে বা যা অনুভূত হচ্ছে, তা হলো শীতকে জিইয়ে রাখার এক অদ্ভুত তাড়না। একসময় Winter is coming বললে একটা গম্ভীর আবহ তৈরি হতো। এখন গরমকাল আসার কথাতেই মানুষের হৃদয় কেঁপে উঠে। যেমনটা আজকাল প্রায়ই কেঁপে উঠে, ঘুমের মধ্যে কিংবা জেগে থাকতেই হঠাৎ করে বিল্ডিং কেঁপে উঠে; ইদানীং ভূমিকম্প হচ্ছে খুব।  গরমকাল মানেই এখন প্রচণ্ড গরম।  উত্তপ্ত চুলার ওপর ভাত যেমন ফটফট শব্দে ফুটতে থাকে, গরমের দিনে শরীরটাও তেমনই সিদ্ধ হতে থাকে। পার্থক্য শুধু এই, এখানে শব্দ শোনা যায় না। সবকিছু ভেতরে ভেতরে ঘুমরে থাকে। ফেব্রুয়ারি মাস চলে এলো। বারো মাসের এক বছরে এই মাসটা আপনের বরাবরের পছন্দের। প্রথমত, মাসটা ছোট। দ্বিতীয়ত, এটা ভালোবাসার মাস, যুগলবন্দী হবার মাস, সরস্বতী পূজার মাস, ভাষা শহীদের মাস, বইমেলার মাস। আর তরীর সঙ্গে প্রথম দেখা হওয়ার মাসও বটে। কিন্তু এই বছরটা কেমন যেন ব্যতিক্রম। শুভ পঞ্চমীর তিথি জানুয়ারিতে পড়ে যাওয়ায় ফেব্রুয়ারি আর সরস্বতী পূজার মাস হলো না। বইমেলাও হচ্ছে না। আরও অনেক কিছুই যেন হলো না। এই মাসটা ক্রমে ‘না-হবার মাস’ হয়ে উঠছে...

A Ruined Rose

  My days were fading away Like a rose forgotten, Between the warm pages of a book. Or  a rose lying silently  Upon the desk of a desolate soul, Slowly surrendering  To the quiet heat of the morning sun. Slowly it withered,  Losing fragrance, color and grace Until nothing remained  But the faint memory of a rose. Sometimes a life, too, Disappears in such silence.