ছোটবেলা থেকেই গিটার শিখার শখ ছিল আপনের। ছোটবেলা থেকে বললে বলা ভুল হবে। বলা ভালো ভার্সিটি উঠার পর তার সে সুপ্ত শখ খুব তীব্র আকারে প্রকাশ পায়। ছোটবেলা থেকে গান আর সুরের প্রতি তার একটা ঝোঁক কাজ করত। পরিবারে সঙ্গীতজ্ঞ মানুষের অভাব না থাকার কারনে স্বভাবেই তার সুর বেঁধে গিয়েছিলো।
তার বড় বোন খুব ভালো গান করতো। স্থানীয় প্রতিযোগিতায় তার গানের কারণে পাওয়া পুরষ্কারে ভর্তি ছিলো বাড়ির একমাত্র আলমারি। পুরষ্কার বলতে কাচের প্লেট ছিলো প্রথম পুরস্কার। যেখানে যা দিয়ে গুনীর কদর করা আর কি।
তো বড় বোন তার প্রতিভার স্বাক্ষর রেখে যেতে পারেনি। তার পরিবারের মধ্যে এই একটা সমস্যা এখনও বর্তমান বলে ধরে নেওয়া যায়। প্রতিভা থাকা সত্ত্বেও স্বপ্নের আকাশটাকে কেউই তারা বড় করে দেখতে পারেনি। মধ্যবিত্ত জীবনে এক লোকের দুই পরিবার চালাতে হলে অনেক জীবন আর স্বপ্নের বিসর্জন দিতে হয়। আর পরিবার বড় হলে তো কথাই নেই। তারপরও এসব দেখতে দেখতে আর এসবের মধ্যে থাকতে থাকতেই কিনা তার মধ্যেও সবকিছু নিয়ে একটা জড়তার ভাব চলে আসে। তারউপর অন্তর্মুখী মানুষের চোখ অন্তরের দিকে থাকার কারণে সেভাবে মানুষজনের সাথে তার মেশা হয়ে উঠেনি।
এভাবেই গড়ে উঠে তার নিজের জীবন। মাঝে মাঝে একা একা, না, সবসময়ই একা একা অনুভূতি তার কাজ করে। একা একাই সে শক্ত আবার একা একা সে দুর্বল। ভার্সিটি উঠে গিটার শিখার ইচ্ছা জেগে উঠল তার। কিন্তু গিটার শিখতে হলে গিটার কিনতে হবে, নিজের যেহেতু আর টিউশন করার সাধ নেই তাই বাবার কাছে হাত পাতা তার হয়ে উঠেনি। ভরা দর্শকের সামনে স্টেজে দাঁড়িয়ে গিটার দিয়ে মনের সব জড়তা আর ঝেরে ফেলা হয়নি।
এভাবে স্বপ্নগুলা ধামা চাপা দিতে দিতে এখন আর কোন স্বপ্ন আসেনা তার। গতিময় পৃথিবীতে এক গতিহীন সত্ত্বা নিয়ে বেঁচে থাকা কঠিন। তার বেঁচে থাকাও মাঝে মাঝে কঠিন মনে হয়। আজকাল ফেলে আসা দিনের কথা মনে আসে। কত সম্ভাবনা ছিলো আর কত কি বিনষ্ট হয়ে গেলো। আফসোস আসে মনে কিন্তু তারপরও একটা কথা আছে তিমিরের গভীর অন্ধকার দূর করতে দেওয়ালের গায়ের ছোট্ট ফোঁটা থেকে ঠিকরে পড়া আলোই যথেষ্ট। তেমনি এক ফোঁটা আশা নিয়ে গভীর বিষাদের সমুদ্র পাড়ি দেওয়া যায়। তাই করছে হয়ত সে।
বেঁচে থাকতে থাকতে একটা জিনিস উপলদ্ধি হয়ে গেছে তার। গ্রহণ করে নিতে পারলেই সব ল্যাটা চুকে যায়। শুধু গ্রহণ করে নেবার ক্ষমতা থাকলেই হলো। এইযে আজকে সে দেশে পড়ে আছে, না ভালো লাগা সত্ত্বেও একটা কর্ম করে যাচ্ছে, না ভালো লাগলেও এই শহরে ঘন গ্যঞ্জামের মধ্যেও দাঁত কামড়ে পড়ে আছে তার একটাই কারণ- নিজের পরিবেশ থেকে, নিজ মানুষজনদের কাছ থেকে দূরে গিয়ে সে ভালো থাকতে পারবে না। কোথাও যেহেতু ভালো থাকা যাচ্ছেনা তাই দেশের মানুষের সাথেই তার দুঃখ ভাগ করে নেওয়া হোক। এই নিয়তি সে গ্রহণ করে নিয়েছে।
গ্রহণ করে নিয়েছে কপালে জুটা সকল পরিস্থিতি। পরিস্থিতি ভালো লাগলে উপভোগ করবে আর খারাপ লাগলেও উপভোগ করবে। জীবনকে ভালোবাসার মতো অনেক কারণ তার নেই হয়তো। কিন্তু জীবনটাকে ছেড়ে দেওয়ারও কোনো কারণ সে খুঁজে পায় না।
রাস্তার ধারে এক ঝাঁক মাধবীলতা ফুটে আছে। টুপটাপ বৃষ্টি হচ্ছে। সেপ্টেম্বরের বৃষ্টি। মাধবীলতাগুলো বৃষ্টিতে ভিজে নুয়ে পড়েছে। ফুল থেকে ফোঁটায় ফোঁটায় জল পড়ছে। অসুন্দর শহরে একটা সুন্দর দৃশ্য।
অসুন্দর শহরের মধ্যে হঠাৎ এমন একটা সুন্দর দৃশ্য দেখে বৃষ্টিতেই আপন দাঁড়িয়ে যায়। কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকে। তারপর কোনো কারণ ছাড়াই মৃদু হাসে। জীবনটা হয়তো তার মনের মতো হয়নি। তবু এই মুহূর্তটা তার মনের কাছাকাছি চলে আসে।
আপন সেটা উপভোগ করে।
Comments
Post a Comment